প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ততই নতুন নতুন ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে ছড়িয়ে পড়ছে। হরমুজ প্রণালির পর এবার লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও তার মিত্রদের ধারাবাহিক সামরিক তৎপরতা সংঘাতকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে উত্তেজনা বাড়ানোই তেহরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।
সংঘাতের শুরু থেকেই হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তেল পরিবহনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পথ ব্যবহারের চেষ্টা করছে। কিন্তু ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি সেই বিকল্প পথগুলোকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের ওপর একসঙ্গে একাধিক চাপ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মান্দাবের আশপাশে হুথিদের সামরিক অগ্রগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কৌশলগত মায়ুন বা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ফলে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে তাদের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বাব আল-মান্দাব এমন একটি সংকীর্ণ নৌপথ, যার মাধ্যমে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়ে থাকে। ফলে সেখানে সামরিক নিয়ন্ত্রণ বা হামলার আশঙ্কা তৈরি হলেই বিশ্ববাজারে তার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রুর মতে, ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক সাফল্য সংঘাতের ভারসাম্যকে আবারও ইরানের দিকে কিছুটা ঝুঁকিয়ে দিয়েছে। তার বিশ্লেষণে, ইরান সরাসরি পূর্ণমাত্রার নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ না করেও মিত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার মাধ্যমে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হচ্ছে।
তবে এই সমীকরণকে সরলভাবে ইরানের সম্পূর্ণ বিজয় হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। ইরান নিজেই এখন তীব্র অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে বন্দর ও সমুদ্রপথে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় দেশটির অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়ছে। ফলে সামরিক ও কৌশলগত কিছু সুবিধা অর্জন করলেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি তেহরানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
এর মধ্যেই তেলের বাজারে অস্থিরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন অবকাঠামোতে হামলার পর বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ থেকে ১১০ ডলারের কাছাকাছি উঠে গেছে। যুদ্ধের আগের তুলনায় এই মূল্যবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে খাদ্য ও শিল্পপণ্যের দাম পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, জ্বালানির মূল্য সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রল ও অন্যান্য জ্বালানির দাম বাড়লে তা মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা ব্যয় এবং রাজনৈতিক জনমত—সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় এই বিষয়টি ওয়াশিংটনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরানের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিটি সংঘাতে মুখোমুখি না গিয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে চাপ তৈরি করা। ইয়েমেনে হুথি, লেবাননে হিজবুল্লাহসহ ইরানঘনিষ্ঠ বিভিন্ন গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তেহরানের প্রভাব বিস্তারের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে এসব গোষ্ঠী কতটা সরাসরি ইরানের নির্দেশনা অনুসরণ করে এবং কতটা নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে কাজ করে—এ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
ইয়েমেনের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। ইরান হুথিদের অস্ত্র, অর্থ ও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়ে থাকে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু হুথিদের প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্ত সরাসরি তেহরানের নির্দেশে নেওয়া হয়—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং হুথিরা নিজেদের স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্যও সামনে রাখে। তবু বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাদের অগ্রগতি যে ইরানের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সৌদি আরবের পরিস্থিতি এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর সৌদি আরব তেল রপ্তানির জন্য তার পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করেছিল। এই পাইপলাইন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের দিকে নিয়ে যায়, যাতে হরমুজ এড়িয়ে তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার পর সেটিও সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরাকের ভূখণ্ড থেকে আসা কয়েকটি ড্রোন হামলায় পাইপলাইনের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। হামলার পর নিরাপত্তার কারণে পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। হামলার জন্য সরাসরি কোনো পক্ষ দায়িত্ব স্বীকার না করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, এর পেছনে ইরানের থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ইরান অবশ্য এমন অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে অস্বীকার করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
একই সময়ে হুথিদের হাতে বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি কৌশলগত অবস্থান চলে যাওয়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির বিকল্প পথও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অর্থাৎ একদিকে হরমুজ প্রণালি, অন্যদিকে বাব আল-মান্দাব—মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথই এখন যুদ্ধের প্রভাবের মধ্যে পড়েছে। এর ফলে শুধু আঞ্চলিক দেশ নয়, ইউরোপ ও এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলোর জন্যও জ্বালানি সরবরাহ একটি বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
এই বাস্তবতায় ইরানের কৌশলকে শুধু সামরিক সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে। তেল সরবরাহে বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর চাপ এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে তেহরান এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে একাধিক ফ্রন্ট সামলাতে হবে।
তবে উত্তেজনা বাড়ানোর এই কৌশল ইরানের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। সংঘাত যত বিস্তৃত হবে, ততই সামরিক প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়লে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সামরিক সহযোগিতায় যেতে পারে। ফলে স্বল্পমেয়াদে ইরান কিছু কৌশলগত সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন বেসামরিক মানুষের জীবন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ঘিরে। যুদ্ধের প্রতিটি নতুন ফ্রন্ট মানে নতুন করে বাস্তুচ্যুতি, সরবরাহ সংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা। ইয়েমেনের মতো দীর্ঘদিনের মানবিক সংকটে থাকা একটি দেশে নতুন করে যুদ্ধ বাড়লে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।
এ কারণে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন আর শুধু দুই দেশের সামরিক শক্তির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ থেকে বাব আল-মান্দাব পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, সৌদি তেল অবকাঠামো, ইয়েমেনের যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। ইরান যদি উত্তেজনা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে সেই কৌশল কতটা সফল হবে তা নির্ভর করবে সংঘাত কতদূর বিস্তৃত হয় এবং ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় তার ওপর। আপাতত যে চিত্রটি স্পষ্ট, তা হলো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন এক অনিশ্চিত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে সামান্য একটি সামরিক পদক্ষেপও বিশ্ববাজার ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।