ইয়েমেনে সৌদির ৫৮ বার বিমান হামলা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার
ইয়েমেনে সৌদির ৫৮ বার বিমান হামলা

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযান আরও তীব্র হয়েছে। হুথি সামরিক শাখার মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সৌদি বিমানবাহিনী ৫৮টি বিমান হামলা চালিয়েছে। হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন উত্তরাঞ্চলীয় কয়েকটি এলাকা এবং অন্যান্য সামরিক অবস্থান এসব হামলার লক্ষ্য ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি এবং কৌশলগত বাব এল মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই সৌদির এই ব্যাপক বিমান অভিযান সামনে এলো।

ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় দাবি করেন, শনিবার রাত থেকে রোববার রাত পর্যন্ত এসব হামলা চালানো হয়। হুথিপন্থি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর ইয়েমেনের সা’দা, মোনাব্বিহ এবং আল জওফসহ হুথিদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে সৌদি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব হামলায় হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

সৌদি আরবের সাম্প্রতিক বিমান অভিযানকে ইয়েমেনে হুথি ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে কম মাত্রায় সংঘাত চললেও চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতি আবার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। বিশেষ করে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল বরাবর হুথিদের সামরিক অগ্রগতি এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের দিকে তাদের অগ্রসর হওয়া সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাব এল মান্দেব প্রণালি। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্তকারী এই সরু জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দিনে হুথিরা ওই অঞ্চলের বেশ কিছু কৌশলগত অবস্থান দখল করে প্রণালিটির ওপর নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। বিশেষ করে মায়ুন বা পেরিম দ্বীপ এবং উপকূলীয় এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এর ফলে সৌদি আরবের বিকল্প তেল রপ্তানি পথও নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতা শুরু হয় কয়েক দিন আগে। হুথিদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, রোববারের আগ পর্যন্ত সৌদি বিমানবাহিনী ১৩০টির বেশি অভিযান চালিয়েছিল। এরপর সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫৮টি হামলার দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যে বিমান হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব সংখ্যার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। ফলে হুথিদের দেওয়া হিসাব স্বাধীনভাবে সম্পূর্ণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এই পাল্টাপাল্টি হামলার পেছনে রয়েছে সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা। হুথিরা কয়েক দিন আগে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের শারুরাহ সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে। তাদের দাবি ছিল, সামরিক স্থাপনা, অস্ত্রভাণ্ডার ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি পক্ষ হামলার বিষয়ে সতর্কতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে। এর পরই ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলা জোরদার হওয়ার ঘটনা দুই পক্ষের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

ইয়েমেনের সংঘাত এখন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার। হুথিরা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সমর্থন পাওয়া একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার সৌদি আরবসহ কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তির সমর্থন পেয়ে আসছে। ফলে ইয়েমেন কার্যত আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ময়দানে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো তেল পরিবহন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বৃহত্তর সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ইতোমধ্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য বাব এল মান্দেব ও লোহিত সাগরের পথ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু হুথিদের অগ্রগতি এবং সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো ও জাহাজকে ঘিরে হামলার আশঙ্কা বাড়লে এই বিকল্প পথও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এরই মধ্যে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক একটি ড্রোন হামলার পর দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার খবর এসেছে। একই সময়ে লোহিত সাগর উপকূলে তেল রপ্তানি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয় এবং বাব এল মান্দেবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তাহলে শুধু সৌদি আরব নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য অবশ্য দিতে হচ্ছে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষকে। কয়েক সপ্তাহের তীব্র লড়াইয়ে পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। সাম্প্রতিক লড়াইয়ে কয়েক হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, পানি ও চিকিৎসার সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইয়েমেনকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে থাকা দেশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। নতুন করে সংঘাত তীব্র হলে সেই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীও হুথিদের কাছ থেকে হারানো অঞ্চল পুনর্দখলের চেষ্টা করছে। পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন ফ্রন্টে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধে সরকারি বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে সৌদি বিমান হামলা যদি স্থল অভিযানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়, তাহলে সংঘাতের পরিধি আরও বাড়তে পারে।

২০১৪ সালে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটি কার্যত দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করে। সে সময় সৌদি আরবের প্রধান লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করা। দীর্ঘ যুদ্ধের পর ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করলেও রাজনৈতিক সমাধান পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পুরোনো সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। হুথিদের পশ্চিম উপকূলে অগ্রগতি, বাব এল মান্দেবের ওপর প্রভাব বৃদ্ধি, সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি এবং পাল্টা সৌদি বিমান অভিযান—সব মিলিয়ে ইয়েমেনে আবার বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ আরও বাড়ছে, কারণ এই সংঘাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থায় সৌদি আরব কতটা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করবে এবং হুথিরা বাব এল মান্দেব ও সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান আরও বাড়াবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সংঘাত যদি দ্রুত রাজনৈতিক সমাধানের পথে না যায়, তাহলে ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তাতেও এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত