ইলিশের দেশে এবার ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২১ বার
ইলিশের দেশে এবার ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশকে বলা হয় ইলিশের দেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ দেশের বিভিন্ন নদনদী এবং বঙ্গোপসাগরের জলসীমায় বিচরণ করা ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যসংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি নাম। প্রতি বছর দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ইলিশের জন্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাজারে তৈরি হয় ব্যাপক আগ্রহ। বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে উৎসবের আগে দুই বাংলার মানুষের মধ্যে তৈরি হয় আলোচনা। কিন্তু এবার সেই চিত্র যেন উল্টে গেছে। বাংলাদেশের বাজারের চাহিদা মেটাতে প্রতিবেশী ভারত থেকেই ইলিশ আমদানি করা হচ্ছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ। এর মধ্যে জুলাই মাসে আমদানি হয়েছে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্টে এসেছে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি। আমদানি করা এসব ইলিশের ঘোষিত মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আমদানির পরিমাণ এতটা বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে ইলিশের জোগান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে মোট ২২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে ইলিশ এনেছে। জুলাইয়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমদানি করা হয় ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি মাছ। পরের মাসে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ইলিশ। দুই মাসে আমদানি করা মাছের ঘোষিত মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা। এর মধ্যে জুলাইয়ের আমদানি মূল্য ছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা এবং আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা।

বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম জানিয়েছেন, প্রথম দুই মাসে আমদানি করা ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ পরীক্ষা করে কোয়ারেন্টাইন সনদ দেওয়া হয়েছে। বন্দরের প্রক্রিয়া শেষে এসব মাছ দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুহুল আমিন জানান, জুলাইয়ে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্টে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ভারতীয় ইলিশ আমদানি হয়েছে। কাস্টমসের ছাড়পত্র এবং বন্দরের প্রয়োজনীয় শুল্ক পরিশোধের পর আমদানিকারকরা বাংলাদেশি ট্রাকে করে মাছগুলো দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে গেছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানির তথ্যও সামনে এসেছে। হাওড়া পাইকারি ফিশ ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বাজারে এবার ইলিশের ঘাটতি থাকায় হাওড়া বাজার থেকেও ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। সাধারণ সময়ে হাওড়া থেকে বাংলাদেশে রুই, পারসে ও ট্যাংরাসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ গেলেও ইলিশের ক্ষেত্রে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।

গুজরাটেও এবার ইলিশের সরবরাহ তুলনামূলক ভালো হওয়ায় ব্যবসায়ীরা কম দামে মাছ সংগ্রহ করতে পারছেন বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদার কারণে এসব মাছ বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। দেশের চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ইলিশের ডিমের আলাদা বাজার রয়েছে। কিছু মাছ নোনা ইলিশ হিসেবেও বাজারজাত করা হয়। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আরও ১০০ থেকে ১৫০ টন ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে।

তবে আমদানি করা ইলিশের বাজারে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তাদের সামনে নতুন এক বাস্তবতাও তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ১ কেজি ২০০ থেকে ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের দেশি ইলিশ কেজিপ্রতি প্রায় ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই ধরনের আমদানি করা ইলিশের দাম প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা। ফলে বড় আকারের মাছ তুলনামূলক কম দামে পাওয়ায় অনেক ক্রেতাই আমদানি করা ইলিশের দিকে ঝুঁকছেন।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমন পরিস্থিতিতে কম দামে বড় আকারের আমদানি করা ইলিশ পাওয়া কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে ক্রেতাদের। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের অনেকেই দেশি ইলিশের পরিবর্তে তুলনামূলক সস্তা আমদানি করা মাছ কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তবে এর বিপরীতে দেশি ইলিশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। তাদের আশঙ্কা, কম দামের আমদানি করা মাছ বাজারে বেশি সরবরাহ হলে স্থানীয় জেলেদের আহরণ করা ইলিশের বিক্রি ও দাম—দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হতে পারে।

আরও একটি অভিযোগ সামনে এসেছে মাছের পরিচয় নিয়ে। বেনাপোল, যশোরের বড় বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে আমদানি করা ইলিশের সরবরাহ বাড়লেও কিছু ব্যবসায়ী এসব মাছকে মিয়ানমারের ইলিশ বলে দাবি করছেন। আবার ক্রেতাদের অভিযোগ, ভারত বা অন্য দেশ থেকে আমদানি করা ইলিশকে পদ্মা, চাঁদপুর, বরিশাল কিংবা চট্টগ্রামের ইলিশ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে ক্রেতারা যেমন প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কায় থাকছেন, তেমনি দেশি ইলিশের প্রকৃত বাজারদর ও মান নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেছেন, আমদানি করা মাছকে দেশি মাছ হিসেবে বিক্রির বিষয়টি মৎস্য আইনের আওতায় সরাসরি পড়ে না। ফলে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত। বাজারে মাছের উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইলিশ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের বড় একটি অংশ বাংলাদেশে হয়। দেশের নদনদী ও বঙ্গোপসাগর ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ বিচরণক্ষেত্র। বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও অর্থনীতিতে ইলিশের গুরুত্বও অনেক। জেলে, আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক, মাছ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ এই মাছের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।

এ অবস্থায় ইলিশের দেশে বিদেশি ইলিশের ওপর নির্ভরতার বিষয়টি শুধু বাজারদরের প্রশ্ন নয়, এটি দেশের জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও ভাবার সুযোগ তৈরি করছে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীতে দূষণ, নাব্য সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইলিশের বিচরণ ও প্রজনন পরিবেশে চাপ তৈরি করতে পারে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, পানির মানের অবনতি এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদনেও পড়তে পারে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের মতে, বাংলাদেশের নদীগুলোর দূষণ ও নাব্য সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় ইলিশের আবাস ও চলাচলের ওপর চাপ বাড়ছে। দেশের নিজস্ব উৎপাদন কমে গিয়ে বাজারের চাহিদা পূরণে প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকলে তা ইলিশের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে উঠতে পারে।

তবে আমদানি হওয়া ইলিশকে কেবল সংকটের প্রতীক হিসেবে দেখার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনার বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট হলে দাম বাড়ে, আর আমদানির মাধ্যমে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হলে দাম কমার সুযোগ থাকে। ফলে ভোক্তার জন্য স্বল্পমেয়াদে আমদানি করা ইলিশ স্বস্তি আনলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশি ইলিশের উৎপাদন, জেলেদের জীবিকা এবং প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।

ইলিশের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ যত গভীর, অর্থনীতিতেও এর গুরুত্ব ততটাই বড়। তাই দেশের বাজারে ভারতীয় ইলিশের উপস্থিতি একদিকে যেমন চাহিদা পূরণের একটি বাস্তব সমাধান, অন্যদিকে এটি দেশের ইলিশ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোরও একটি দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি। নদী ও সাগরের পরিবেশ রক্ষা, ইলিশের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, জেলেদের স্বার্থ রক্ষা এবং টেকসই আহরণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের ইলিশের নিজস্ব উৎপাদন শক্তিশালী রাখা সম্ভব হবে। আর সেটিই হয়তো নিশ্চিত করবে—‘ইলিশের দেশে’ ভবিষ্যতে নিজের ইলিশের জন্য বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত