স্থানীয় নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং বরদাশত করা হবে না

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
স্থানীয় নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং বরদাশত করা হবে না

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা বাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যেই স্থানীয় নির্বাচনে কোনো ধরনের কারচুপি, সমঝোতা কিংবা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ বরদাশত করা হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মাওলানা শেখ ফজলুল করীম মারুফ।

তিনি বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনে সমঝোতা ও ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে যে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা জনগণ ভুলে যায়নি। ভবিষ্যতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও যদি কোনো ধরনের অনিয়ম, কারচুপি বা পরিকল্পিতভাবে ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে জনগণ তা মেনে নেবে না। বরং যেকোনো ধরনের নির্বাচনী কারচুপির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক বিভাগ, নির্বাচন ও জনপ্রতিনিধি বিভাগ, ছাত্রী ও মহিলা বিভাগ এবং ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিভাগের এক জরুরি সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মাওলানা শেখ ফজলুল করীম মারুফ। সভায় সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন এবং স্থানীয় নির্বাচনসহ সাংগঠনিক নানা বিষয়ে আলোচনা হয়।

মাওলানা শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদে সাত মাস অতিক্রান্ত হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে দীর্ঘ সময় নির্বাচিত প্রতিনিধিশূন্য রাখলে জনগণের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব বাড়তে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রসঙ্গ তুলে ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা অভিযোগ করেন, সেখানে বিএনপি দলীয় প্রশাসক দায়িত্বে থাকলেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও তাদের ভাষায় ‘ফ্যাসিবাদের দোসর ও মদদপুষ্ট’ ব্যক্তিরা এখনো বহাল রয়েছেন। এসব ব্যক্তিকে দ্রুত অপসারণের দাবি জানান তিনি।

তার বক্তব্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক কাঠামো কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা প্রশ্ন ও মতপার্থক্য রয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

মাওলানা শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকলে স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা ও প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে স্থানীয় উন্নয়ন, নাগরিক সেবা, অবকাঠামো, জনসম্পৃক্ততা এবং জবাবদিহির বিষয়ও জড়িত। তাই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার বা ফলাফল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলে তা স্থানীয় গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার মধ্য দিয়ে দলটির নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তিনি দাবি করেন, অতীতের নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, ভবিষ্যতের স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতির পাশাপাশি ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ের নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। ফলে স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতিও ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে থাকে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্থানীয় নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবি জানানো এবং একই সঙ্গে নির্বাচনে কোনো ধরনের কারচুপি না করার বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিতে পারে। দলটির নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই ভোটাধিকার, সুষ্ঠু নির্বাচন ও জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়গুলো সামনে রেখে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে আসছেন। এবার স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে একই অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হলো।

সভায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নগর সেক্রেটারি কে এম শরীয়াতুল্লাহর সঞ্চালনায় সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে নগর সহসভাপতি আলহাজ আবদুল আউয়াল মজুমদার, জয়েন্ট সেক্রেটারি ফজলুল হক মৃধা, অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মুফতি আবদুল আহাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ নজরুল ইসলাম খোকনসহ মহানগর ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর নেতারা ছিলেন।

এ ছাড়া মাওলানা নজরুল ইসলাম, মাওলানা কামাল হোসাইন, টিএম মাহফুজ, হাফেজ সালাহউদ্দীন, মাওলানা তারিক মাসউদ, আলহাজ বেলাল হোসেন আরিফ, ছাত্রী ও মহিলা ইউনিট সম্পাদক হাফেজ মাওলানা মাহবুবুর রহমান, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক আকন, সহছাত্রী ও মহিলা ইউনিট সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মাদ আবু বকর এবং সহনির্বাচন ও জনপ্রতিনিধি সম্পাদক মুহাম্মাদ আবু হানিফ সভায় উপস্থিত ছিলেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনও এখন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের প্রত্যাশা, নাগরিক সেবা এবং জনপ্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা কী হবে এবং প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে কখন নির্বাচন আয়োজন করা হবে—এসব প্রশ্ন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

তবে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি নির্বাচনের পরিবেশ, ভোটারদের নিরাপত্তা, প্রার্থীদের সমান সুযোগ এবং ভোটের ফলাফল নিয়ে আস্থার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ থাকলেও যদি ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সেই নির্বাচন দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক আস্থা শক্তিশালী করতে পারে না। তাই ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, তা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের অবস্থান নয়; বরং স্থানীয় নির্বাচনকে কীভাবে আরও গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক করা যায়, সেই বৃহত্তর আলোচনার অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে এবং কী প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে, সেটিই রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের সময়সূচি ও কাঠামো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। এরই মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ স্পষ্ট করে দিয়েছে, নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের কারচুপি বা সমঝোতার মাধ্যমে ফলাফল প্রভাবিত না করার বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দেবে।

সামনের দিনগুলোতে স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ—সবকিছুর সমন্বয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। জনগণের ভোটের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হয়, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত