প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর মধ্যেই রয়েছে সম্ভাবনার বিশাল ভাণ্ডার। সঠিক শিক্ষা, নিরাপদ পরিবেশ, সুস্থ জীবনযাপন, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ পেলে এই শিশুরাই ভবিষ্যতে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম শক্তিতে পরিণত হতে পারে। আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিমানবাহিনীর ব্লু স্কাই স্কুল ফর স্পেশাল চিলড্রেন পরিদর্শনকালে তিনি এসব কথা বলেন। পরিদর্শনের সময় তিনি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন। শিশুদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ ও প্রতিভা দেখে তিনি তাদের সম্ভাবনা বিকাশের জন্য আরও সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
জুবাইদা রহমান বলেন, প্রতিটি শিশুর জীবন অগণিত সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু তার নিজের পরিবারের ওপর নির্ভর করে না; তার বিকাশের সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বও গভীরভাবে জড়িত। শিশুদের সামনে যদি যথাযথ সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে তাদের স্বপ্ন ও প্রতিভা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হতে পারে।
তিনি শিশুদের জন্য একটি সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা একটি শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য যথেষ্ট নয়। শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিরাপদ ও সবুজ খোলামাঠে অবাধে বিচরণের সুযোগও প্রয়োজন।
শিশুদের যেকোনো ধরনের অসুস্থতার ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসার নিশ্চয়তা থাকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার বক্তব্যে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে আলাদা কোনো বিষয় হিসেবে না দেখে সামগ্রিক বিকাশের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। একটি শিশু যদি মানসিকভাবে সুস্থ, শারীরিকভাবে সক্ষম এবং শিক্ষার সুযোগপ্রাপ্ত হয়, তাহলে তার নিজের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার পথও সহজ হয়।
জুবাইদা রহমান বিশেষভাবে কন্যাশিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, উচ্চতর স্তরে কন্যাশিশুদের লেখাপড়া অবৈতনিক করার মতো উদ্যোগ তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথকে আরও সহজ করে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে শিশুরা নিজেদের যোগ্যতা প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু পড়াশোনার ফলাফলের ভিত্তিতে একটি শিশুর সক্ষমতা বিচার করা যায় না। গান, নাচ, আবৃত্তি, অভিনয়, চিত্রাঙ্কন, খেলাধুলা কিংবা অন্যান্য সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েও শিশুদের ভেতরের প্রতিভা প্রকাশ পায়। সঠিক প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যা পেলে সেই প্রতিভা আরও বিকশিত হতে পারে।
ব্লু স্কাই স্কুল ফর স্পেশাল চিলড্রেনের শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দেখে জুবাইদা রহমান তাদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিশুরা প্রমাণ করেছে যে প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে তারা অত্যন্ত সুন্দরভাবে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরতে পারে। একই সঙ্গে সবাই মিলে একটি কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার যে মানসিকতা তারা দেখিয়েছে, সেটি ভবিষ্যৎ জীবনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নয়, খেলাধুলা ও সামাজিক জীবনেও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। একজন শিশুর মধ্যে সহযোগিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের গুণ তৈরি করতে সহশিক্ষা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব কার্যক্রমকে শিক্ষার পরিপূরক হিসেবে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
শিশুদের প্রতি উৎসাহের বার্তা দিয়ে জুবাইদা রহমান বলেন, তারা যেন আকাশচুম্বী স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। তাদের মনোবল শক্ত রাখতে পরিবার ও সমাজকে পাশে থাকতে হবে। অভিভাবকরা যেমন নিজেদের সন্তানকে ভালোবাসেন, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছেও প্রতিটি শিশু মূল্যবান—এই উপলব্ধি আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামের প্রতিটি শিশুর কাছে সমান সুযোগ পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়। শহরের তুলনায় প্রত্যন্ত এলাকার অনেক শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পর্যাপ্ত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। ফলে শিশুর সম্ভাবনা বিকাশের উদ্যোগকে শুধু শহরকেন্দ্রিক না রেখে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য আলাদা যত্ন ও সুযোগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সমাজের কোনো শিশুই যেন অবহেলা, দারিদ্র্য, প্রতিবন্ধকতা কিংবা সুযোগের অভাবে নিজের স্বপ্ন থেকে দূরে সরে না যায়—এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিও তুলে ধরেন জুবাইদা রহমান। তিনি বিমানবাহিনী মহিলা কল্যাণ সমিতির বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, নারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কারুশিল্পসহ বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তোলার উদ্যোগ পরিবার ও সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু পরিবারের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে পূর্ণাঙ্গ ফল পাওয়া সম্ভব নয়। শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সমাজের সচেতন মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে।
বর্তমান সময়ে শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির বিস্তার যেমন শিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি অতিরিক্ত নির্ভরতা শিশুদের শারীরিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার ঝুঁকিও তৈরি করছে। এ বাস্তবতায় পড়াশোনার পাশাপাশি মাঠে খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া এবং প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দাবি করে। পড়াশোনা, প্রতিযোগিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত চাপ অনেক শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে শিশুরা নিজেদের কথা বলতে পারে, ভুল থেকে শিখতে পারে এবং ভয় বা চাপ ছাড়াই নিজের প্রতিভা প্রকাশ করতে পারে।
জুবাইদা রহমানের বক্তব্যে মূলত একটি সমন্বিত শিশুবান্ধব সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয়তাই উঠে এসেছে। যেখানে একটি শিশুর পরিচয় হবে না শুধু তার পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে; বরং তার স্বপ্ন, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধও হবে বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ব্লু স্কাই স্কুল পরিদর্শনের সময় শিশুদের বিভিন্ন কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করার মধ্য দিয়ে তিনি তাদের প্রতি উৎসাহ ও আস্থার বার্তা দেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে এসব শিশু ভবিষ্যতে নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শক্তিশালী করতে শিশুদের জন্য বিনিয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। একটি শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার অর্থ শুধু একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা নয়; বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি শক্ত করা। তাই শিশুদের সম্ভাবনা যেন কোনো ধরনের অবহেলায় ঝরে না পড়ে, সে জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
জুবাইদা রহমানের বক্তব্য সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে সামনে এনেছে। প্রতিটি শিশুকে স্বপ্ন দেখার সুযোগ দেওয়া, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং তাদের সুস্থ, নিরাপদ ও আনন্দময় শৈশবের পরিবেশ তৈরি করাই হতে পারে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।