প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা বাড়তে থাকায় প্রায় ১৪ মাস পর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিশেষ করে জ্বালানি তেল আমদানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে দেশে ডলারের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। একই সময়ে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার ছয়টি ব্যাংকের কাছে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ মার্কিন ডলার বিক্রি করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে ডলারের সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির পরিবর্তে উল্টো বাজার থেকে ডলার কিনছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি ব্যয় বাড়তে থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাহিদার চাপ তৈরি হয়েছে। সেই চাপ কিছুটা কমাতেই আবারও রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডলারের দামের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সোমবার দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল ১২৩ টাকা ২০ পয়সা। মঙ্গলবার তা বেড়ে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে ডলারের গড় দর ১৫ পয়সা বেড়েছে। বিনিময় হারের এই পরিবর্তন খুব বড় না হলেও বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ার একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৭ দশমিক ৫৫ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১০৩ দশমিক ২৭ ডলারে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে হামলার পর সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে এই ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার ওপর পড়ে। কারণ জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ ডলার প্রয়োজন হয়। তেলের দাম বাড়লে একই পরিমাণ পণ্য আমদানি করতেও আগের তুলনায় বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। ফলে আমদানি বিল বেড়ে গেলে ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদাও বাড়ে। আর সেই চাহিদা যদি রপ্তানি আয় ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের মাধ্যমে পর্যাপ্তভাবে পূরণ না হয়, তখন বাজারে চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
গত বছরের জুলাই থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাজার থেকে ডলার কেনার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছিল। সে সময় বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছিল এবং চাহিদার চাপও আগের তুলনায় কমে এসেছিল। বাজারে অতিরিক্ত ডলার সরবরাহ থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা কিনে রিজার্ভ বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাজারের অতিরিক্ত সরবরাহও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৬০০ কোটি ডলার কিনেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ডলার কেনার কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে বাজারে ডলারের সরবরাহ পরিস্থিতিও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। ফলে ওই সময় থেকে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির প্রয়োজন দেখা দেয়নি।
কিন্তু চলতি অর্থবছরের শুরুতে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির চিত্র পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশের আমদানি বিল আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলজাত পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ। জ্বালানি আমদানিতে এত বড় প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে একই সময়ে রপ্তানি আয়ে কিছুটা দুর্বলতা দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে দেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৪৩৫ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। একটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আমদানি ও রপ্তানির ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি ব্যয় বাড়ার বিপরীতে রপ্তানি আয় কমে গেলে বাজারে ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বাড়তে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ব্যবধানের চাপই ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির সিদ্ধান্তকে বাজারে বড় ধরনের সংকটের সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হওয়ার আগেই সরবরাহ বাড়িয়ে বিনিময় হার ও বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার একটি নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে এটিকে দেখা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন প্রয়োজন অনুযায়ী রিজার্ভ থেকে ডলার বাজারে সরবরাহ করে, তখন ব্যাংকগুলোর তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণে সহায়তা পাওয়া যায়। এর ফলে ডলারের দামে আকস্মিক ও অতিরিক্ত অস্থিরতা ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতার জন্য শুধু রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় শক্তিশালী রাখা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এদিকে ডলারের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু ব্যাংকিং খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আমদানি করা কাঁচামাল, জ্বালানি, শিল্পের যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্যের ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। ব্যবসায়ীদের আমদানি ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ পণ্যের দামে প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো রিজার্ভের নিরাপত্তা বজায় রেখে বাজারে প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহ নিশ্চিত করা। একদিকে বাজারের চাহিদা পূরণে ডলার সরবরাহ করতে হবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কমে না যায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে পরিমাণ ডলার কিনেছে, তার ফলে রিজার্ভে কিছুটা সুরক্ষা তৈরি হয়েছে। এখন বাজারের চাহিদার ধরন এবং আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্যের গতিপথের ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কতটা ডলার বিক্রি করতে হয়।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম, দেশের আমদানি পরিস্থিতি এবং রপ্তানি আয়ের গতিপথ—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদি তেলের দাম আরও বাড়ে এবং একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তাহলে ডলারের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। বিপরীতে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় শক্তিশালী হলে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়বে এবং চাপ কিছুটা কমে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, ১৪ মাস পর রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার বিক্রি বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে পরিবর্তিত চাহিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। এখন পর্যন্ত বিক্রির পরিমাণ তুলনামূলক সীমিত হলেও এর মাধ্যমে বাজারে প্রয়োজনীয় তারল্য নিশ্চিত করার চেষ্টা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, বাড়তে থাকা আমদানি ব্যয় এবং রপ্তানি আয়ের সামান্য পতনের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন নজর রাখার বিষয়। বাজারে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী পদক্ষেপ বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।