জরুরি ভিত্তিতে উড়োজাহাজ কিনবে সরকার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
জরুরি ভিত্তিতে উড়োজাহাজ কিনবে সরকার

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে উড়োজাহাজের স্বল্পতা দূর করতে জরুরি ভিত্তিতে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের জাতীয় পতাকাবাহী এই বিমান সংস্থার বহর আধুনিকায়ন এবং যাত্রীসেবা আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে নতুন উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।

মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আধুনিকায়ন, নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহ এবং এয়ারবাস কেনার প্রক্রিয়াসহ বিমান খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

মন্ত্রী জানান, বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে প্রয়োজনের তুলনায় উড়োজাহাজের সংখ্যা কম। এর ফলে বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট পরিচালনা, সময়সূচি ঠিক রাখা এবং যাত্রীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় দ্রুত বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে দ্রুততার সঙ্গে কেনাকাটার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি স্পষ্ট করেছেন।

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে সরকার কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো করে অনিয়মের সুযোগ তৈরি করতে চায় না। বরং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই প্রয়োজনীয় উড়োজাহাজ সংগ্রহ করা হবে। এ ক্ষেত্রে হাই লেভেল নেগোশিয়েশন কমিটির সুপারিশকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কমিটির সুপারিশের আলোকেই সরকার পরবর্তী সময়ে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকায়নের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের যাতায়াত, পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ও আধুনিক উড়োজাহাজ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে এসব ক্ষেত্রে বিমানের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

নতুন উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আধুনিকায়নের বিষয়টিও ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক বিমান পরিবহন খাতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, জ্বালানি দক্ষতা, যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব উড়োজাহাজ ব্যবহারের বিষয়গুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের বিমান খাতও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। এয়ারবাস কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা সেই বৃহত্তর আধুনিকায়ন পরিকল্পনারই অংশ।

বৈঠকে বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার বিষয়টিও উঠে আসে। মন্ত্রী জানান, ২০১৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের ওপর হাই রিস্ক কার্গো অ্যান্ড মেইল বা এইচআরসিএম স্ট্যাটাস আরোপ করেছিল। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে কার্গো ও ডাক পরিবহনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়। এতে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় উভয়ই বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বিমান কার্গো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দ্রুত পচনশীল পণ্য, উচ্চমূল্যের পণ্য, জরুরি চালান এবং সময়সীমাবদ্ধ রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে আকাশপথে পরিবহন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কার্গো পরিবহনে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বিধিনিষেধ থাকলে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ বাড়ে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে এইচআরসিএম স্ট্যাটাস প্রত্যাহার বাংলাদেশের বিমান ও বাণিজ্য খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার।

মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই স্ট্যাটাস প্রত্যাহারের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বিমানবন্দরে প্রয়োজন অনুযায়ী এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম বা ইডিএস স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ ধরনের প্রযুক্তি কার্গো ও অন্যান্য সামগ্রীতে বিস্ফোরক বা ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা ও নজরদারি ব্যবস্থা ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে।

মন্ত্রী আরও জানান, সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া অডিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সন্তোষজনক রেটিং অর্জন করেছে। বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অডিট গুরুত্বপূর্ণ। সন্তোষজনক মূল্যায়ন পাওয়ার পর সরকার আশা করছে, বাংলাদেশের ওপর আরোপিত এইচআরসিএম স্ট্যাটাস প্রত্যাহারের বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে।

বাংলাদেশের বিমান খাতের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ কার্গো পরিবহন সহজ ও দ্রুত হলে দেশের রপ্তানিকারকদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পাঠানোর সুযোগ আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হলে বিদেশি এয়ারলাইনস, বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়িক অংশীদারদের আস্থাও বাড়তে পারে।

বৈঠকে বাংলাদেশের বিমান খাতের সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকেও আগ্রহের কথা জানানো হয়। ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বলেন, বাংলাদেশের হসপিটালিটি খাতের বিকাশে যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশের পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের অ্যাভিয়েশন হাব প্রতিষ্ঠার অগ্রযাত্রায় যুক্তরাজ্য সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানান ব্রিটিশ হাইকমিশনার। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সম্ভাবনাময় বিমান যোগাযোগকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিমানবন্দর অবকাঠামো, কার্গো ব্যবস্থাপনা, যাত্রীসেবা এবং আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশকে একটি কার্যকর আঞ্চলিক অ্যাভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুধু নতুন উড়োজাহাজ কেনাই যথেষ্ট নয়। বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনবল তৈরি, কার্গো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের যাত্রীসেবা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল সংক্রান্ত সহযোগিতা ও যোগাযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ তাই শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক বিমান পরিবহন খাতের ভবিষ্যৎ সক্ষমতার বিষয়টিও জড়িত। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট বাড়ানো, নতুন গন্তব্যে যাওয়ার সুযোগ তৈরি এবং যাত্রীদের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য সেবা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে উড়োজাহাজ কেনার মতো বড় আর্থিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি উড়োজাহাজের ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ, বিমা এবং পরিচালন ব্যয়ও বিবেচনায় রাখতে হয়। তাই সরকারের পক্ষ থেকে হাই লেভেল নেগোশিয়েশন কমিটির সুপারিশ অনুসরণ এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির যে কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করাই এখন বড় বিষয়।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানে উন্নীত করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এইচআরসিএম স্ট্যাটাস প্রত্যাহারের উদ্যোগ সফল হলে দেশের কার্গো পরিবহন ও রপ্তানি বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহ, বিমানবন্দর নিরাপত্তা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা—এই তিনটি উদ্যোগ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশের বিমান খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।

এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রয়োজনীয় উড়োজাহাজ দ্রুত সংগ্রহের পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখা। সেই সঙ্গে বিমানবন্দর নিরাপত্তার উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জনের কাজও অব্যাহত রাখতে হবে। এসব উদ্যোগ সফল হলে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পথও আরও সুগম হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত