ম্যানচেস্টার ডার্বির ভুলে শাস্তি ভিএআর রেফারির

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৫ বার
ম্যানচেস্টার ডার্বির ভুলে শাস্তি ভিএআর রেফারির

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ম্যানচেস্টার ডার্বির মতো আলোচিত ম্যাচে একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত শুধু মাঠের ফলাফলেই প্রভাব ফেলে না, সেটি আলোচনায় নিয়ে আসে পুরো রেফারিং ব্যবস্থাকেও। গত রোববার ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটির ম্যাচে আর্লিং হলান্ডের জয়সূচক গোল বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্কের পর এবার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ওই ম্যাচের ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর কর্মকর্তা ম্যাট ডোনহিউকে।

প্রফেশনাল গেম ম্যাচ অফিশিয়ালস লিমিটেড বা প্রো রেফ-এর মূল্যায়নে গোলটি বহাল রাখার ক্ষেত্রে ভিএআরের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। বিশেষ করে গোলের বিল্ডআপে ম্যানচেস্টার সিটির মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজের অবস্থান এবং সেই অবস্থান খেলায় কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সেটি যথাযথভাবে বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন ভিএআর কর্মকর্তা—এমনটাই মনে করছে রেফারিদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাটি।

বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা মুহূর্তটি আসে ম্যানচেস্টার সিটির আক্রমণের সময়। গোলের প্রস্তুতি পর্বে ফার্নান্দেজের অবস্থান অফসাইড ছিল কি না এবং তিনি সেই অবস্থানের মাধ্যমে খেলার ওপর প্রভাব ফেলেছিলেন কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। মাঠের সিদ্ধান্তকে প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই করার দায়িত্বে থাকা ভিএআর দল বিষয়টি পর্যালোচনা করলেও শেষ পর্যন্ত গোলটি বহাল রাখে।

ম্যাচের ভিএআর কর্মকর্তা ছিলেন ম্যাট ডোনহিউ এবং সহকারী ভিএআর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ব্লেক অ্যানট্রোবাস। ভিডিও পর্যালোচনার পর তারা মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রয়োজন মনে করেননি। ফলে হলান্ডের গোলটি বৈধ থাকে এবং সেই গোলেই ম্যানচেস্টার সিটি ডার্বিতে জয় পায়।

পরবর্তী পর্যালোচনায় অবশ্য রেফারিং কর্তৃপক্ষ ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। তাদের মতে, ভিডিও পর্যালোচনার সময় ফার্নান্দেজের অবস্থান খেলার ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, সেটি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে মাঠের রেফারিকে অনফিল্ড রিভিউ করার পরামর্শ দেওয়া উচিত ছিল ভিএআর কর্মকর্তার। অর্থাৎ প্রযুক্তিগত সহায়তা ব্যবহার করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে মাঠের রেফারির নিজস্ব পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

এই ভুলের পরই ডোনহিউকে চলতি সপ্তাহের প্রিমিয়ার লিগের কোনো ম্যাচে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। রেফারিং কর্মকর্তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিরতির কারণে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ডোনহিউ ও অ্যানট্রোবাস আগামী ১০ অক্টোবরের আগে আর কোনো প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না বলে জানা গেছে।

রেফারিং ব্যবস্থায় ভুল সিদ্ধান্ত নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি প্রযুক্তি চালুর অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভুল কমিয়ে আনা এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তে মাঠের রেফারিকে সহায়তা করা। ফলে ভিএআর ব্যবহারের পরও যখন বড় ম্যাচে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে যায়, তখন প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ম্যানচেস্টার ডার্বির এই ঘটনা সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। মাঠের রেফারির পাশাপাশি ভিএআর কক্ষে থাকা কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তও এখন ম্যাচের ফলাফলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের নির্ভুলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রত্যাশা অনেক বেশি।

প্রো রেফ-এর প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা হাওয়ার্ড ওয়েবের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থায় ম্যাচ কর্মকর্তাদের ভুলের পর তাদের পরবর্তী দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়টি নিয়মিত মূল্যায়নের আওতায় থাকে। ডোনহিউকে সাময়িকভাবে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার সিদ্ধান্তকে সেই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই ঘটনায় সহকারী ভিএআর কর্মকর্তা ব্লেক অ্যানট্রোবাসকেও চলতি সপ্তাহে কোনো ম্যাচের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

ডোনহিউর জন্য ঘটনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সালে তিনি ইংলিশ ফুটবল লিগের সহকারী রেফারিদের তালিকায় উন্নীত হন। পরে ২০২৪ সালের মে মাসে প্রিমিয়ার লিগে রেফারি হিসেবে অভিষেক হয় তার। গত দুই বছর ধরে তাকে নিয়মিত ভিএআর দায়িত্বেও দেখা গেছে। ফলে ম্যানচেস্টার ডার্বির মতো বড় ম্যাচে তার সিদ্ধান্তের ভুল তার দায়িত্ব পালনের ওপর স্বাভাবিকভাবেই বড় চাপ তৈরি করেছে।

এর আগে ইংলিশ ফুটবলে ভিএআর ও রেফারিং ভুল নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০২৩ সালে টটেনহাম হটস্পারের বিপক্ষে লিভারপুলের একটি গোল ভুলভাবে বাতিল হওয়ার ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেই ঘটনায় ম্যাচের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভুল প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়। ম্যানচেস্টার ডার্বির সাম্প্রতিক বিতর্কের সঙ্গে সেই ঘটনাটির তুলনা টেনে রেফারিং মহলের কেউ কেউ বর্তমান পরিস্থিতিকে প্রো রেফ-এর জন্য সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম কঠিন সময় হিসেবে দেখছেন।

বিশেষ করে বড় ম্যাচে ভুলের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বেশি থাকে। ম্যানচেস্টার ডার্বির মতো ম্যাচে প্রতিটি গোল, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি মুহূর্তের মূল্য অনেক বেশি। দুই দলের সমর্থকদের আবেগ, লিগের অবস্থান এবং ম্যাচের ফলাফল—সবকিছুর সঙ্গে একটি সিদ্ধান্ত জড়িয়ে যেতে পারে। তাই কোনো বিতর্কিত গোল বহাল থাকলে মাঠের বাইরে তার প্রতিক্রিয়াও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ভিএআর প্রযুক্তি মূলত রেফারিকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করার জন্য চালু করা হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের পরও প্রতিটি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত একেবারে স্বয়ংক্রিয় হয় না। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মাঠের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হয় এবং সেখানে কর্মকর্তার বিচারবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অফসাইডের মতো কিছু ক্ষেত্রে প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারলেও কোনো খেলোয়াড়ের অবস্থান খেলার ওপর প্রভাব ফেলেছে কি না—এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানবিক মূল্যায়ন প্রয়োজন হয়।

ম্যানচেস্টার ডার্বির ঘটনাতেও মূল বিতর্কটি ছিল ঠিক এই জায়গায়। ফার্নান্দেজের অবস্থান শুধু অফসাইড ছিল কি না, সেটি নয়; সেই অবস্থানের কারণে গোলের বিল্ডআপে খেলার ওপর প্রভাব পড়েছিল কি না, সেটিই ছিল সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রো রেফ-এর মতে, এই বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি।

ডোনহিউকে সাময়িকভাবে ম্যাচের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত তাই শুধু একজন কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না। এর মাধ্যমে রেফারিং কর্তৃপক্ষ বড় ম্যাচে সিদ্ধান্তের মান, ভিএআর ব্যবহারের পদ্ধতি এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহির বিষয়টিও সামনে আনছে। ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে ম্যাচ কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সতর্কভাবে পর্যালোচনা করা হতে পারে।

এদিকে ম্যানচেস্টার সিটির জয় নিয়ে মাঠের ফলাফল পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত নেই। ম্যাচে হলান্ডের গোল বহাল রয়েছে এবং সেই ফলাফলই কার্যকর। তবে গোলটি ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক ফুটবল সমর্থকদের আলোচনায় আরও কিছুদিন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

রেফারিংয়ের ভুল নিয়ে বিতর্ক ফুটবলের নতুন কিছু নয়। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের প্রত্যাশাও বদলেছে। এখন অনেক সমর্থক মনে করেন, ভিডিও প্রযুক্তি যখন মাঠের সিদ্ধান্ত যাচাই করার সুযোগ দিচ্ছে, তখন গুরুত্বপূর্ণ ভুলের সম্ভাবনা আরও কমে আসা উচিত। একই সঙ্গে রেফারিং কর্তৃপক্ষের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তিকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে খেলার স্বাভাবিক গতি বজায় রেখেও সিদ্ধান্তের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা যায়।

ম্যানচেস্টার ডার্বির ঘটনাটি সেই ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তাই আবার সামনে এনেছে। ডোনহিউ ও অ্যানট্রোবাসের সাময়িক অনুপস্থিতি দিয়ে আপাতত তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ভিএআর ব্যবস্থার ওপর দর্শক ও ক্লাবগুলোর আস্থা কতটা শক্তিশালী করা যায়, সেটিই হতে পারে এই বিতর্কের বড় শিক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত