তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন অর্থায়ন সুবিধা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন অর্থায়ন সুবিধা

প্রকাশ:  ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের তরুণদের ব্যবসা ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু ঋণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উপজেলা পর্যায় থেকেই সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করা, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়নের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির আওতায় ২৮ বছর বয়স পর্যন্ত তরুণদের ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। কর্মসূচিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক প্রয়োজন বিবেচনায় ঋণের পাশাপাশি সমপরিমাণ অনুদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সবকিছু যাচাই-বাছাইয়ের পর একজন উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়ন দেওয়ার সুযোগ থাকছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তবে প্রত্যেক উদ্যোক্তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সর্বোচ্চ অর্থ দেওয়া হবে না। ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন, সম্ভাব্য ব্যয়, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং উদ্যোগটির বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই করেই অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। ফলে কর্মসূচির আওতায় অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে ব্যবসার প্রয়োজন ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ থাকছে।

বাংলাদেশের বহু তরুণের মধ্যে ব্যবসা করার আগ্রহ ও নতুন উদ্যোগের ধারণা থাকলেও অর্থের অভাবে তারা সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দিতে পারেন না। বিশেষ করে ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে জামানত, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান অনেকের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উপজেলা পর্যায়ে আরও একটি সমস্যা হলো, সম্ভাবনাময় অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোগ থাকলেও সেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের আওতায় আসতে পারে না।

নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে এসব সীমাবদ্ধতা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায় থেকেই উদ্যোক্তা শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা তরুণরা এ সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবেদনকারীর নিজস্ব ব্যবসায়িক উদ্যোগ থাকতে হবে অথবা বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকতে হবে। তবে আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসার জন্য ঋণ নেওয়া ব্যক্তি, ঋণখেলাপি এবং সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা এই সুবিধার আওতায় আসবেন না।

এই কর্মসূচিতে ব্যাংকের ভূমিকা শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। সংশ্লিষ্ট উপজেলার সব তফসিলি ব্যাংকের শাখাকে স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার চালিয়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা খুঁজে বের করার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। আবেদন গ্রহণ, প্রাথমিক যাচাই এবং উদ্যোক্তা নির্বাচনের বিভিন্ন পর্যায়েও ব্যাংকগুলোর সম্পৃক্ততা থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি উপজেলায় একটি তফসিলি ব্যাংককে লিড ব্যাংক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। জেলা পর্যায়ের আবেদন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও লিড ব্যাংক ভূমিকা পালন করবে। এর ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে শুধু অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় ব্যাংকিং কাঠামোর মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরির একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় আবেদন করার সুযোগ থাকবে। যে ব্যাংকে আবেদন করা হবে, সেখানে আগে থেকেই হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। আবেদন প্রক্রিয়ায় জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, ছবি, নির্ধারিত আবেদন ফরম এবং স্থায়ী বাসিন্দার প্রমাণপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে।

তরুণদের জন্য ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাগুলোর একটি হলো জামানত। অনেক নতুন উদ্যোক্তার জমি, বাড়ি বা অন্য কোনো সম্পদ থাকে না, যা ব্যাংকের কাছে জামানত হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব। এ কারণে নতুন কর্মসূচিতে সহায়ক জামানত ছাড়াই ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে ব্যবসার সম্ভাবনা ও পরিকল্পনা থাকলেও জামানতের অভাবে যারা ব্যাংকিং অর্থায়ন থেকে বাদ পড়তেন, তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে জামানত না থাকাকে ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। উদ্যোক্তা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজস্ব ঋণনীতি এবং প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করে ঋণ অনুমোদন করবে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত উদ্যোক্তার ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে তার কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে তা জানাতে হবে। এর মাধ্যমে উদ্যোক্তা নির্বাচন ও ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

শুধু অর্থায়ন করলেই একজন নতুন উদ্যোক্তা সফল হবেন—এমন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানো, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি, মেন্টরের পরামর্শ এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএনের মতো প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক নিবন্ধন ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাজারসংযোগ তৈরির বিষয়টিও কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন ব্যবসা শুরু করার পর পণ্য বা সেবা বাজারজাত করতে না পারলে অর্থায়নও কার্যকর ফল দিতে পারে না। তাই উদ্যোক্তাদের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা এবং ব্যবসা পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ কর্মসূচিটিকে কেবল ঋণভিত্তিক প্রকল্পের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।

‘উদ্যোগ’ কর্মসূচিতে কোনো একটি নির্দিষ্ট খাতকে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য, পশুপালন, হস্তশিল্প, পর্যটন, সেবা, হালকা প্রকৌশল, সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো বিভিন্ন খাতে তরুণদের ব্যবসায়িক উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রেও সুযোগ রাখা হয়েছে। ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-কমার্স, ফিনটেক, এডটেক, এগ্রিটেক ও হেলথটেকের মতো নতুন খাতেও সম্ভাবনাময় উদ্যোগকে বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ থাকছে।

উদ্যোক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু বয়স বা আবেদন করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে না। ব্যবসার ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত, পণ্য বা সেবার বাজার কতটা সম্ভাবনাময়, উদ্যোক্তার দক্ষতা ও সক্ষমতা কেমন, আর্থিক পরিকল্পনা কতটা কার্যকর এবং উদ্যোগটি কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক, সফল উদ্যোক্তা, ব্যাংকার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সম্পৃক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবসার সম্ভাবনা, দক্ষতা ও বাস্তব পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও স্থানীয় সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবসা গড়ে উঠলে তা শুধু একজন তরুণের আয় বাড়াবে না, বরং স্থানীয়ভাবে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

অর্থ ছাড়ের পরও উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ব্যবসার বিক্রি, নগদ প্রবাহ, ঋণ পরিশোধ এবং কর্মসংস্থান তৈরির অগ্রগতি সম্পর্কে নজরদারি করা হবে। বিশেষ করে অনুদানের অর্থ অনুমোদিত কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা বা অনুদানের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার না করার মতো পরিস্থিতিতে অনুদানের সমপরিমাণ অর্থও ঋণে পরিণত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগের মূল পরিবর্তন হলো, উপজেলা পর্যায়ের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সরাসরি উদ্যোক্তা তৈরির সঙ্গে যুক্ত করা। অর্থের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং, ব্যবসা নিবন্ধনে সহায়তা এবং বাজারসংযোগের ব্যবস্থা থাকায় এটি তরুণদের জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোক্তা সহায়তা কাঠামো হিসেবে কাজ করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। তাদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। বিশেষ করে রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যবসার বাইরে উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় চাহিদা ও সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হলে গ্রামীণ অর্থনীতিও আরও সক্রিয় হতে পারে। তবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে যোগ্য উদ্যোক্তা নির্বাচন, দ্রুত ও স্বচ্ছ অর্থায়ন, প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি বজায় রাখা গেলে তরুণদের ব্যবসায়িক সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত