বিদেশে অর্থ বিনিয়োগের প্রমাণে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা আসিফের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
বিদেশে অর্থ বিনিয়োগের প্রমাণে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা আসিফের

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিদেশে নিজের এক টাকা বিনিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেলেই রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। একই সঙ্গে নিজের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার, সম্পদ অর্জন এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন তিনি।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নিজের ভ্যারিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক লাইভে এসব কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। সেখানে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগে একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানান।

বিদেশে বিনিয়োগের অভিযোগ প্রসঙ্গে আসিফ মাহমুদ বলেন, দেশের বাইরে তার এক টাকাও বিনিয়োগ বা সম্পদ থাকার প্রমাণ কেউ দিতে পারলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি বলেন, বিদেশে তার এক টাকা বিনিয়োগ কিংবা দেশের বাইরে সামান্য পরিমাণ জমি বা সম্পদ থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও তিনি সেদিনই রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াবেন।

তার এমন বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তার বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর এই বক্তব্য দেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি এবং বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলমান রয়েছে বলে আসিফ নিজেই জানিয়েছেন।

বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের যে অঙ্কগুলো প্রচার করা হচ্ছে, সেগুলো একটি ফেসবুক পেজের পুরোনো পোস্টের তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি ওই পেজকে আওয়ামী লীগের প্রচারপেজ হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে এসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

আসিফ মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, অভিযোগগুলো যে উৎস থেকে এসেছে, সেটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

তবে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফলকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ। আসিফ মাহমুদও তার বক্তব্যে তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালের কর্মকাণ্ড নিয়েও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এনসিপির এই নেতা। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুদক চার সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠন করে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চেয়েছে বলে তিনি জানান।

আসিফের দাবি, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অনেক ক্ষেত্রে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন সেগুলো ইতোমধ্যে প্রমাণিত সত্য। এর ফলে তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, তদন্ত শেষে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হলেও এর মধ্যে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি হওয়ার, সেটি আর সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

তিনি গণমাধ্যমের একটি অংশেরও সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, আকর্ষণীয় বা চটকদার শিরোনামের মাধ্যমে অভিযোগগুলো উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং তার বক্তব্য যথাযথভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না। এ ধরনের সংবাদ পরিবেশনের কারণে তিনি ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ শিকার হচ্ছেন বলেও দাবি করেন।

আসিফ মাহমুদ বলেন, দুদকের তদন্ত শেষ হতে কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছরও সময় লাগতে পারে। কিন্তু তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগেই যদি জনমনে কোনো ব্যক্তিকে দোষী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে পরবর্তীতে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও তার ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়, তা সহজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্প নিয়েও নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব দেন তিনি। প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়ানোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসিফ বলেন, প্রকল্পের পরিধি পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বেড়েছে। তার দাবি, শুরুতে প্রায় ১৫০টি স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা প্রায় সব উপজেলায় সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ ছাড়া প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ, প্যাভিলিয়ন নির্মাণ, দর্শকদের বসার ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধির প্রয়োজন হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সংশোধিত প্রকল্পটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদিত হয় এবং বর্তমানে সেটি বাস্তবায়নাধীন।

তবে প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়ে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে কাজ বন্ধ করে দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন আসিফ মাহমুদ। এতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম হয়ে থাকলে তার তদন্ত হওয়া উচিত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

নিজের দায়িত্ব পালনকালে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা তার কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট ছিলেন বলেও দাবি করেন আসিফ। তার অভিযোগ, সেই অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই বর্তমান সময়ে তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও অভিযোগের বিষয়গুলো সামনে আনা হচ্ছে। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট নেতাদের নাম প্রকাশ করেননি।

অর্থ পাচারের অভিযোগের সঙ্গে নিজের পরিবারের সদস্যদের নাম জড়ানোর বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তার দুই বোনজামাই এবং এক ভাগ্নে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত—এমন অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন আসিফ। তিনি বলেন, তার মাত্র একজন বোনজামাই রয়েছেন এবং তার ভাগ্নের বয়স প্রায় আড়াই থেকে তিন বছর।

একটি শিশুর নাম অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগের সঙ্গে জড়ানো অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার বক্তব্য, অভিযোগ প্রকাশ বা প্রচারের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

আসিফ মাহমুদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল—তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের। তিনি দাবি করেন, কোনো অভিযোগ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া এবং অভিযোগের উৎস ও তথ্য যাচাই করা জরুরি।

রাজনীতিতে সক্রিয় একজন নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়াও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং তার দেওয়া ব্যাখ্যা—দুই দিকই যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

শেষে আসিফ মাহমুদ সবার প্রতি অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার আহ্বান জানান। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা চটকদার শিরোনামের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।

বিদেশে এক টাকা বিনিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেলে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণার মাধ্যমে নিজের অবস্থানকে কঠোরভাবে তুলে ধরেছেন এনসিপির এই মুখপাত্র। এখন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে চলমান তদন্তের ফলাফলই নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলোর বাস্তব ভিত্তি কতটা। আর সেই ফলাফলের আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার এবং আনুষ্ঠানিক তদন্ত—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখাই হবে দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত