ইন্টারনেট বন্ধের প্রতিবাদে ক্ষোভ বাড়ছে পাক-শাসিত কাশ্মীরে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
ইন্টারনেট বন্ধের প্রতিবাদে ক্ষোভ বাড়ছে পাক-শাসিত কাশ্মীরে

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে টানা ১০০ দিন ধরে আংশিক ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরুর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে মোবাইল ডেটা ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পরিষেবা সীমিত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিন ধাপে নির্বাচন সম্পন্ন হলেও নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়নি। ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার বদলে দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও আর্থিক কার্যক্রমে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে।

জুনের শুরুতে নির্বাচনী সংস্কারসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয়ে ওঠে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে। তৃণমূল পর্যায়ের বিভিন্ন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘জম্মু-কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’ ওই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সামনে আসে। সংগঠনটি আইনসভার সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল। কর্তৃপক্ষ ৫ জুন সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পাশাপাশি একই দিন ওই অঞ্চলে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেয়।

ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্তের পর থেকেই সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে শুরু করে। মোবাইল ডেটা ও ব্রডব্যান্ড সংযোগ সীমিত থাকায় মানুষ অনলাইন যোগাযোগ, ডিজিটাল সেবা এবং তথ্যপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে থাকে অর্থনীতি ও জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

স্বাধীন ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ জুন থেকে অঞ্চলটিতে আংশিক ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট চলছে। শুরুতে স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও তা পুরোপুরি তুলে না নেওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে, জননিরাপত্তার জন্য নেওয়া সাময়িক পদক্ষেপ কেন এত দীর্ঘ সময় ধরে বহাল রাখা হচ্ছে।

নির্বাচনের শেষ ধাপ ১০ আগস্ট শেষ হয়েছে। এরপর নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রমও ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে। কিন্তু ইন্টারনেটের ওপর বিধিনিষেধ বহাল থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে নাগরিকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে।

সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে ব্যবসা ও আর্থিক খাত। ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল ব্যাংকিং সেবা ব্যাহত হওয়ায় অনেক গ্রাহক ব্যাংকের ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে পারছেন না। অনলাইন লেনদেন, হিসাব যাচাই, অর্থ স্থানান্তরসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে শুধু বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, ছোট ব্যবসায়ী, দোকানদার ও সাধারণ গ্রাহকরাও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

বর্তমান সময়ে একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবস্থা সরাসরি যুক্ত। অনলাইন পেমেন্ট, ডিজিটাল ব্যাংকিং, ব্যবসায়িক যোগাযোগ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, অনলাইন কেনাকাটা এবং দূরবর্তী কর্মসংস্থান—সবকিছুর ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ধরে সংযোগে বাধা থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে গতি কমেছে এবং উদ্যোক্তাদের অনেকে অতিরিক্ত সময় ও খরচের মুখে পড়ছেন।

শিক্ষাক্ষেত্রেও এর প্রভাব গভীর। শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস, শিক্ষাসামগ্রী সংগ্রহ, আবেদন প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ইন্টারনেটনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা এখন বিশ্বের অনেক অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক মাধ্যম। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার কারণে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের শিক্ষার্থীরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

পরিস্থিতির কারণে সরকারকে ভর্তি পরীক্ষাও স্থগিত করতে হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার প্রস্তুতি, আবেদন ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনলাইন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সংযোগ না থাকায় তাদের সময়সূচি, প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে।

ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু অর্থনীতি ও শিক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই। পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ, জরুরি তথ্য পাওয়া, সংবাদ গ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারেও মানুষ সমস্যায় পড়ছে। কোনো অঞ্চলে দীর্ঘদিন ইন্টারনেট সীমিত থাকলে স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এতে গুজব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

এর আগে ২৭ জুলাই অঞ্চলটিতে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ওই সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাত সদস্যও ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে হতাহতের এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংঘর্ষের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও কঠোর হয়ে ওঠে এবং কয়েকটি বিক্ষোভপ্রবণ এলাকায় ভোটগ্রহণও করা সম্ভব হয়নি।

নিরাপত্তাজনিত কারণে সব এলাকায় একইভাবে ভোট আয়োজন করা সম্ভব না হলেও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের অন্যান্য এলাকার নির্বাচনী ফলাফলের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হলেও ইন্টারনেট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিকতা পুরোপুরি ফিরে আসেনি।

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের রাজনৈতিক কাঠামোও এই পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কাশ্মীর দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধপূর্ণ অঞ্চল। দুই দেশই পুরো কাশ্মীরের ওপর নিজেদের দাবি করে আসছে। পাকিস্তান-শাসিত অংশটি একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। সেখানে একজন প্রধানমন্ত্রী এবং ৪৫ সদস্যের আইনসভা রয়েছে।

আইনসভার ৪৫টি আসনের মধ্যে ১২টি সংরক্ষিত আসন ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে আসা শরণার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে। পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসরত এসব শরণার্থীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। এই সংরক্ষিত আসন বাতিলের দাবিই সাম্প্রতিক আন্দোলনের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।

আন্দোলন দমনে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এবং দীর্ঘস্থায়ী ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সীমিত সময়ের জন্য যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচন শেষ হয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও যদি ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকে, তাহলে নাগরিকদের স্বাভাবিক অধিকার ও জনজীবনের স্বাভাবিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য শুধু নির্বাচন সম্পন্ন করাই যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। ব্যবসা পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ—এসব এখন আধুনিক জীবনের মৌলিক অংশ। দীর্ঘ সময় ধরে এসব সুবিধা সীমিত থাকলে মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে এখন তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা আর কতদিন চলবে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। এমন বাস্তবতায় দীর্ঘদিনের যোগাযোগ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

টানা ১০০ দিনের এই ইন্টারনেট সংকট শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি এখন মানুষের শিক্ষা, জীবিকা, ব্যবসা, যোগাযোগ এবং তথ্য পাওয়ার সুযোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি মানবিক সংকটেও পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নেওয়া একটি সাময়িক সিদ্ধান্ত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় এর চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জনজীবন পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে হলে ইন্টারনেট পরিষেবা পুনর্বহাল করা এবং নাগরিকদের স্বাভাবিক ডিজিটাল জীবনে ফিরিয়ে আনা এখন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত