প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও অবস্থান নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) জিএস এস এম ফরহাদ। তার অভিযোগ, বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরিচালন নীতি অতীতের আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের সময়কালের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার নীতিকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার ডাকসু সংগ্রহশালা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এসব কথা বলেন।
ডাকসু সংগ্রহশালায় ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বাংলা ভাষাবিরোধী বক্তব্যের ছবি ও উদ্ধৃতি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রশাসনের সঙ্গে ডাকসু প্রতিনিধিদের এই আলোচনা হয়। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দেওয়া বিবৃতি এবং তাদের অবস্থান নিয়েই মূলত আপত্তি জানিয়েছেন ডাকসুর জিএস।
এস এম ফরহাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে গিয়ে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তৎকালীন বক্তব্যের একটি উদ্ধৃতি ও ছবি প্রদর্শন করা হয়েছিল। তার দাবি, সেখানে বক্তব্যটি সমর্থন বা প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়, বরং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখছে এবং এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রশাসনের দেওয়া বিবৃতির ভাষা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ডাকসুর জিএস। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাসে কোনো ঘটনা ঘটার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে’ ধরনের ভাষায় বিবৃতি দেওয়ার নজির তিনি দেখেননি। তার অভিযোগ, প্রশাসনের সাম্প্রতিক বিবৃতির ভাষা এমন পর্যায়ে গেছে যে সেটিকে কোনো রাজনৈতিক দলের দলীয় পোস্টের সঙ্গে তুলনা করা যায়।
ডাকসু সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত জিন্নাহর বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে এস এম ফরহাদ বলেন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে এবং বাংলার বিরোধিতায় জিন্নাহ যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেটি ঐতিহাসিকভাবে নথিভুক্ত। সেই বক্তব্যের একটি উদ্ধৃতি ও ছবি সংগ্রহশালায় প্রদর্শন করা হয়েছিল বলে জানান তিনি। তার বক্তব্য, কোনো ঐতিহাসিক বক্তব্য উদ্ধৃত করা মানেই সেই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া নয়; বরং ইতিহাসের বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে মানুষের সামনে তুলে ধরাই ছিল উদ্দেশ্য।
তিনি দাবি করেন, জিন্নাহর ভাষাবিষয়ক বক্তব্য বাংলাদেশের বিভিন্ন পাঠ্যবইয়েও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণির বাংলা এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে বিষয়টি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে প্রশাসনের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তিনি বলেন, যদি ওই বক্তব্য উদ্ধৃত করাই অপরাধ হয়, তাহলে একই বিষয় পাঠ্যবইয়ে থাকা নিয়েও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রশ্ন তোলা উচিত।
এস এম ফরহাদ আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাষা আন্দোলন ও পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক ইতিহাস পড়ানো হয়। ফলে একটি সংগ্রহশালায় সেই সময়ের কোনো বক্তব্য বা ঐতিহাসিক দলিল প্রদর্শন করা হলে সেটিকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটিই মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত। ইতিহাসের কোনো বিতর্কিত বক্তব্যকে প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা ছাড়া প্রচার করা এবং ইতিহাসের দলিল হিসেবে তা উপস্থাপন—দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলেও তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ডাকসু জিএস। তার দাবি, ডাকসু সংগ্রহশালা উদ্বোধনের আগে উপাচার্য দুইবার সেখানে পরিদর্শন করেছিলেন এবং সংগ্রহশালার কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এ কারণে প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু নিয়ে যদি প্রশাসনের কোনো আপত্তি থেকে থাকে, তাহলে উদ্বোধনের আগেই তা নিয়ে আলোচনা করা যেত বলে মনে করেন তিনি।
তার অভিযোগ, ডাকসুর সভাপতি হিসেবে উপাচার্য চাইলে বিষয়টি নিয়ে ডাকসুর সঙ্গে আলোচনা করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে একটি রাজনৈতিক দলের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিবৃতি প্রশাসনের পেজে প্রকাশ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এই অবস্থানকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বর্তমান অবস্থানকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করেন এস এম ফরহাদ। তার বক্তব্য, গত পাঁচ দশকে বিভিন্ন সরকারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়েছে। সামরিক শাসনের সময়, বিএনপি সরকারের সময় এবং আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের সময়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন ভাষায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তিনি দেখেননি। তার অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসন অতীতের সেই নীতিকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
তবে ডাকসু সংগ্রহশালা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি সেখানে হামলা ও সম্পদ ভাঙচুরের অভিযোগও সামনে এনেছেন ডাকসু জিএস। তিনি বলেন, একটি ঐতিহাসিক ও শিক্ষামূলক সংগ্রহশালা শুধু একটি কক্ষ বা প্রদর্শনীর জায়গা নয়; এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন এবং শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক স্মৃতির সম্পর্ক রয়েছে। সেখানে কোনো ধরনের হামলা বা সম্পদ নষ্ট করা হলে তা শুধু ডাকসুর সম্পদের ক্ষতি নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের ওপরও আঘাত।
এ কারণে সংগ্রহশালায় হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, কোনো প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু নিয়ে মতভেদ বা আপত্তি থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু মতপার্থক্যের জেরে সম্পদ নষ্ট বা হামলার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ডাকসু সংগ্রহশালা ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক মূলত ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বাধীনতা কতটা থাকবে এবং ঐতিহাসিক দলিল প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কী ধরনের নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত—এসব প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তান আমলের ইতিহাসসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে গবেষণা ও প্রদর্শনীর দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ফলে একটি ঐতিহাসিক বক্তব্য প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক শিক্ষাঙ্গনে ইতিহাসচর্চার পদ্ধতি নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে প্রশাসন ও ডাকসুর মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিসেবে ডাকসু একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের অধিকার ও প্রতিষ্ঠানিক স্বার্থ নিয়ে কথা বলছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব হলো শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় না হলে এ ধরনের বিতর্ক আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও আলোচনা হয়ে আসছে। সেই ইতিহাসের বিভিন্ন চরিত্রের বক্তব্য, রাজনৈতিক অবস্থান এবং তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দলিল সংরক্ষণও ইতিহাসচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এসব দলিল প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যাখ্যা ও প্রেক্ষাপট নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে দর্শক বা শিক্ষার্থীরা বক্তব্যের ঐতিহাসিক তাৎপর্য সঠিকভাবে বুঝতে পারেন।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বিবৃতির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা, সংযম এবং আলোচনার সুযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিষয়ে বিতর্ক দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য শোনা এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে উত্তেজনা কমানো সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে মতপ্রকাশ ও ইতিহাসচর্চার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা থাকলে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কমে।
ডাকসু জিএসের বক্তব্যে বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উঠে এসেছে, সেগুলো তার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান থেকে দেওয়া মন্তব্য। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিস্তারিত বক্তব্য বা ব্যাখ্যা থাকলে সেটিও জনসমক্ষে আসা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিতর্কিত একটি ঘটনার পূর্ণ চিত্র পেতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য জানা প্রয়োজন।
সবশেষে, ডাকসু সংগ্রহশালা নিয়ে চলমান বিতর্ক শুধু একটি ছবি বা একটি উদ্ধৃতি প্রদর্শনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস সংরক্ষণ, শিক্ষাঙ্গনে মতপ্রকাশ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে উত্তেজনা বা পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পরিবর্তে তথ্য, ইতিহাস ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের ভিত্তিতে বিষয়টির সমাধানই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসমাজের জন্য বেশি ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে সংগ্রহশালায় হামলা বা সম্পদ ভাঙচুরের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে একটি সুস্পষ্ট বার্তাও দেওয়া সম্ভব হবে।