প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি কোচে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় একটি কোচ পুড়ে গেছে। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হলো, এর পেছনে কোনো কারিগরি ত্রুটি ছিল কি না কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে তদন্ত কমিটি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) আনিসুর রহমান রাতে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, ঢাকা বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তাকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা অঞ্চলের রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) কমান্ড্যান্ট, বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী, বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ক্যারেজ) এবং রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।
তদন্ত কমিটিতে রেলওয়ের বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার ফলে ঘটনাটি একাধিক দিক থেকে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিবহন ব্যবস্থাপনা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, কোচের যান্ত্রিক অবস্থা, স্টেশনের নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড—সবগুলো বিষয়ই তদন্তের আওতায় আসতে পারে। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তাও তদন্তের মাধ্যমে উঠে আসতে পারে।
রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে হাওর এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় একটি কোচে আগুন দেখা যায়। ট্রেনটি তখন যাত্রার প্রস্তুতিতে ছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। রাত ৯টা ৪৬ মিনিটের দিকে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং রাত ৯টা ৫২ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর সংশ্লিষ্টরা দেখতে পান, ট্রেনের একটি কোচের ভেতরের বেশ কিছু অংশ পুড়ে গেছে। তবে এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে অবস্থান করায় এবং আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হওয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাওর এক্সপ্রেসের নিয়মিত যাত্রার সময়ও এ ঘটনার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ট্রেনটি রাত ১০টা ১৫ মিনিটে মোহনগঞ্জের উদ্দেশে কমলাপুর স্টেশন ছাড়ার কথা ছিল। অর্থাৎ নির্ধারিত যাত্রার অল্প সময় আগে ট্রেনের একটি কোচে আগুন লাগে। যাত্রী পরিবহনের আগে আগুনের ঘটনা ঘটায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কোচের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রেলওয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ঘটনার পর আগুনের ধরন নিয়েও নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। ঢাকা বিভাগ রেলওয়ের ব্যবস্থাপক এ বি এম কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, আগুনে হাওর এক্সপ্রেসের একটি কোচ পুড়ে গেছে। আগুন দ্রুত কোচের বড় অংশে ছড়িয়ে পড়ার আলামত দেখে তাঁর কাছে পেট্রোল বা গানপাউডারের মতো দাহ্য পদার্থ ব্যবহারের সম্ভাবনা মনে হয়েছে। তবে এটি কোনো চূড়ান্ত তদন্তের ফল নয়; বরং প্রাথমিক পর্যায়ের একটি ধারণা হিসেবে বিষয়টি সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, আগুনের কারণ নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। কিছু প্রতিবেদনে রেলওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশের কথা এসেছে। আবার অন্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ তখনো নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অগ্নিকাণ্ডকে দুর্ঘটনা, কারিগরি ত্রুটি বা পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড—কোনো একটি কারণের সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত করা সমীচীন নয়।
তদন্ত কমিটির সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত বিশ্লেষণ করা। আগুনের সূত্রপাত কোন অংশ থেকে হয়েছে, আগুন কীভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, কোচের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা স্বাভাবিক ছিল কি না এবং সেখানে কোনো দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে আগুন লাগার সময় কোচের আশপাশে কারা ছিলেন, স্টেশনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কী অবস্থায় ছিল এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে কী তথ্য পাওয়া যায়, তাও যাচাই করা হতে পারে।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন দেশের অন্যতম ব্যস্ত রেল যোগাযোগকেন্দ্র। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী এই স্টেশন ব্যবহার করেন। ফলে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা শুধু একটি কোচের ক্ষয়ক্ষতির বিষয় নয়; এটি স্টেশন ও ট্রেনের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে যাত্রা শুরুর আগে একটি ট্রেনে আগুন লাগার ঘটনা রেলওয়ের অগ্নিনিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
রেলওয়ে পরিবহন ব্যবস্থায় একটি অগ্নিকাণ্ড খুব দ্রুত বড় ধরনের দুর্ঘটনায় রূপ নিতে পারে। ট্রেনের কোচে আসন, পর্দা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য উপকরণ থাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে একটি প্ল্যাটফর্মে একাধিক ট্রেন বা বিপুলসংখ্যক যাত্রী অবস্থান করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এ কারণে কমলাপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে দ্রুত সতর্কতা, নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয় এবং ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ঘটনায় দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনায় পরিস্থিতি বড় আকার ধারণ করেনি। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কোচের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং ট্রেনটির পরিচালনায় দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নের বিষয়। ক্ষতিগ্রস্ত কোচটি কীভাবে মেরামত বা প্রতিস্থাপন করা হবে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে এখন ঘটনাটির আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানের পথ তৈরি হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও আলামতের ভিত্তিতে আগুনের প্রকৃত কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের দায়িত্ব বা সংশ্লিষ্টতা থাকলে সেটিও চিহ্নিত করার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে যদি নিরাপত্তা বা ব্যবস্থাপনায় কোনো দুর্বলতা পাওয়া যায়, তাহলে তা সংশোধনের সুপারিশ করা সম্ভব হবে।
কমলাপুরের এই অগ্নিকাণ্ডে কোনো প্রাণহানি না হলেও একটি যাত্রীবাহী ট্রেনের কোচ পুড়ে যাওয়ার ঘটনা রেলওয়ের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে ব্যস্ত স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জামের কার্যকারিতা, নজরদারি এবং নিরাপত্তাকর্মীদের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের। আগুনের উৎস ও কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। তার আগে প্রাথমিক ধারণা বা সন্দেহকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করাই হবে দায়িত্বশীল অবস্থান। একই সঙ্গে রেলওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের ঘটনার পর প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।