রাজ্য নির্বাচনে ধাক্কা, পদ ছাড়ছেন না ফ্রিডরিখ মের্জ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
রাজ্য নির্বাচনে ধাক্কা, পদ ছাড়ছেন না ফ্রিডরিখ মের্জ

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জার্মানির দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়েছে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের নেতৃত্বাধীন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ)। বিশেষ করে মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্ন রাজ্যে দলটির ভোট ৫ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে নির্বাচনী ফলাফলের পর নিজের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে নাকচ করেছেন মের্জ। তিনি জানিয়েছেন, চার বছরের জন্য নির্বাচিত সরকারকে মেয়াদ পূর্ণ করার লক্ষ্যেই তিনি কাজ করে যাবেন।

২০ সেপ্টেম্বর জার্মানির রাজধানী বার্লিন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। দুটি নির্বাচনই কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, জাতীয় সরকারের নেতৃত্বে থাকা সিডিইউর ফলাফল যেমন প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল হয়েছে, তেমনি অভিবাসন ও অর্থনৈতিক নীতিকে কেন্দ্র করে আলোচিত দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডির শক্ত অবস্থানও আরও স্পষ্ট হয়েছে।

মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নে প্রাথমিক চূড়ান্ত ফলাফলে এএফডি ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়ে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দল হয়েছে। ক্ষমতাসীন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এসপিডি পেয়েছে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে মের্জের সিডিইউ পেয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। জার্মানির রাজ্য পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য সাধারণত ৫ শতাংশ ভোটের প্রয়োজন হওয়ায় এই ফলাফলে সিডিইউ রাজ্য পার্লামেন্টের বাইরে চলে গেছে। জার্মানির যুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসে এই রাজ্যে দলটির এমন ফল আগে দেখা যায়নি।

সিডিইউর জন্য এই ফলাফল শুধু একটি রাজ্য নির্বাচনের পরাজয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দলটির জাতীয় নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন। চলতি বছর জার্মানির কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে সিডিইউ প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি। এর মধ্যে মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নের ফলাফল দলটির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে ৫ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় রাজ্য আইনসভায় দলটির কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকবে না।

অন্যদিকে এএফডির ভোটের পরিমাণ দলটির সাম্প্রতিক উত্থানকে আরও দৃশ্যমান করেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নে দলটি ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এবার সেই ভোটের হার দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এর ফলে রাজ্যটিতে এএফডি সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও অন্য দলগুলো এএফডির সঙ্গে জোট গঠনে অনাগ্রহী হওয়ায় দলটি সরাসরি সরকার গঠন করতে পারবে কি না, তা আলাদা রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নির্ভর করছে।

বার্লিনের নির্বাচনের ফলাফলও জার্মানির রাজনৈতিক চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সেখানে ডি লিংকে বা বামপন্থী দল সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দলটির ভোট প্রায় ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ। সিডিইউ পেয়েছে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ, এএফডি ১৬ দশমিক ২ শতাংশ, গ্রিনস ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং এসপিডি ১২ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে রাজধানীতেও আগের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

দুটি রাজ্যের ফলাফলের পর স্বাভাবিকভাবেই মের্জের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সিডিইউ নেতৃত্বের বৈঠকে মের্জ জানিয়েছেন, তিনি দায়িত্ব পালন করে যাবেন। তিনি বলেন, জার্মানির বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সংস্কার বাস্তবায়ন এবং সেই দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেছেন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, করব্যবস্থা, পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় পরিবর্তনের যে কর্মসূচি তার সরকার হাতে নিয়েছে, সেগুলো এগিয়ে নেওয়ার কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

মের্জের জন্য অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জার্মানির শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চাপ তৈরি হয়েছে। উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে গাড়ি শিল্পে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক মনোভাবেও প্রভাব ফেলছে। মের্জ সরকার অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই সংস্কারের গতি ও প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

এএফডির ভোট বৃদ্ধির পেছনে অভিবাসন প্রশ্নের পাশাপাশি অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ ভূমিকা রাখছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জার্মান সরকারের অবস্থান নিয়েও এএফডি সমালোচনা করে আসছে। তবে কোনো একটি কারণকে এএফডির ভোট বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না; অঞ্চলভেদে ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দের পেছনে বিভিন্ন বিষয় কাজ করছে।

এএফডির উত্থান জার্মানির প্রচলিত দলগুলোর সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে এএফডির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট বা সরকার গঠনের সহযোগিতা এড়িয়ে চলেছে। জার্মান রাজনৈতিক পরিভাষায় এই অবস্থানকে ‘ফায়ারওয়াল’ নীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নে এএফডি সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়ার পরও অন্য দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সমীকরণে এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নে এসপিডি দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও রাজ্যটির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মানুয়েলা শভেসিগ নিজের আসনে এএফডির প্রার্থীর বিরুদ্ধে জয় পেয়েছেন। নির্বাচনের পর তিনি দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ফলে এএফডি সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও রাজ্যটির সরকার গঠনের প্রশ্নটি এখনও জোটের সমীকরণের ওপর নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে জার্মান রাজনীতিতে ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দের পরিবর্তনও স্পষ্ট হচ্ছে। এর আগে চলতি মাসে স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে এএফডি বড় ব্যবধানে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল। এরপর মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নেও দলটির প্রথম হওয়া জার্মানির মূলধারার দলগুলোর জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

তবে রাজ্য নির্বাচনের ফলাফলকে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী ফল হিসেবে দেখা যায় না। জার্মানির ফেডারেল ও রাজ্য রাজনীতির কাঠামো আলাদা এবং প্রতিটি রাজ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক ইস্যু, প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ও জোটের সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে সর্বশেষ ভোটের মাধ্যমে মের্জ সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়লেও কেন্দ্রীয় সরকারের মেয়াদ বা মের্জের পদে থাকা নিয়ে তাৎক্ষণিক সাংবিধানিক পরিবর্তন ঘটছে না।

মের্জের সামনে এখন দুটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে তাকে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে, অন্যদিকে বিভিন্ন রাজ্যে সিডিইউর দুর্বল ফলাফল এবং এএফডির বাড়তে থাকা সমর্থনের রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। তার সরকার যেসব সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, সেগুলোর বাস্তব ফলাফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সর্বশেষ দুই রাজ্যের নির্বাচন তাই জার্মান রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—প্রধান দলগুলোর প্রচলিত রাজনৈতিক সমীকরণ আগের মতো স্থির নেই। মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নে সিডিইউর ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল ফল এবং এএফডির উত্থান, আর বার্লিনে ডি লিংকের এগিয়ে যাওয়া—দুই ঘটনাই রাজনৈতিক দৃশ্যপটে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মের্জ পদে থেকে সংস্কার কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার নেতৃত্বে সিডিইউ এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেয়, সেটিই এখন জার্মান রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত