প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে লাভের আশায় হিমাগারে সংরক্ষণ করা আলুই এখন কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে আলুর দাম উৎপাদন, পরিবহন, শ্রমিক ও সংরক্ষণ ব্যয়ের তুলনায় কম থাকায় প্রতি কেজিতে ৬ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ফলে হিমাগারে বিপুল পরিমাণ আলু পড়ে থাকলেও বাজারদর অনুকূলে না থাকায় তা বের করে বিক্রি করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না অনেকে।
উপজেলার ধাপেরহাট এলাকার আরভি কোল্ডস্টোরে চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা মোট ১ লাখ ২৫ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। প্রতি বস্তায় ছিল ৬৫ কেজি করে আলু। হিমাগার কর্তৃপক্ষের হিসাবে বর্তমানে প্রায় ৯৫ হাজার বস্তা আলু এখনো সংরক্ষিত রয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ১৭৫ টন। বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় এসব আলুর বড় অংশ এখনো হিমাগার থেকে বের করা হয়নি।
হিমাগারের ম্যানেজার হামিদুল ইসলাম জানান, আলু কেনার পর পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি, চটের বস্তা এবং হিমাগারে সংরক্ষণের ভাড়াসহ বিভিন্ন খরচ যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রতি কেজি আলুর ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু বর্তমান বাজারদর সেই ব্যয় মেটানোর মতো না হওয়ায় প্রতি কেজিতে ৬ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। এ কারণেই অনেক ব্যবসায়ী হিমাগারে রাখা আলু তুলছেন না।
ব্যবসায়ী আনোয়ারুল ইসলামের হিসাবে, আলু কেনা থেকে শুরু করে হিমাগারে সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতি কেজিতে তাঁর খরচ পড়েছে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ টাকা। অথচ বর্তমানে সেই আলু বিক্রি করতে গেলে ১১ থেকে ১২ টাকার বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সংরক্ষিত আলু বাজারে তুললে সরাসরি বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হবে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ব্যবসা করার পর এমন পরিস্থিতিতে পুঁজি ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরেক ব্যবসায়ী গোবিন্দ চন্দ্র সরকার জানান, আগের মৌসুমের লোকসানে তাঁর ব্যবসার পুঁজি প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপরও ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার আশায় আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে এবার আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু চলতি মৌসুমেও লোকসানের মুখে পড়ায় তাঁর আর্থিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। একদিকে হিমাগারে আলু পড়ে আছে, অন্যদিকে ধার করা অর্থ পরিশোধের চাপ রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে আবার আলু ব্যবসায় বিনিয়োগ করার সক্ষমতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সাদুল্লাপুরে চলতি মৌসুমে লালপাকড়ি, কার্ডিনাল, ডায়মন্ড, সাদাহল্যান্ড ও বার্মাসহ বিভিন্ন জাতের আলুর চাষ হয়েছে। আলু উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকদের বড় একটি ব্যয় হয়েছে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে। বিশেষ করে মৌসুমের শুরুতে বীজ আলুর দাম তুলনামূলক বেশি থাকায় কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
সাদুল্লাপুর শহরের সুজন বীজ ভান্ডারের মালিক সুজন কুমার সরকার জানান, রোপণ মৌসুমে তিনি প্রতি কেজি বীজ আলু ১১০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। অনেক কৃষক আরও বেশি দামে বীজ কিনেছেন। এরপর সার, কীটনাশক, সেচ, জমি প্রস্তুত ও শ্রমিকের খরচ যোগ হওয়ায় মাঠপর্যায়ে আলু উৎপাদনের মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তাঁর হিসাবে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১০ থেকে ১২ টাকা ছাড়িয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ মৌসুমে সাদুল্লাপুর উপজেলায় প্রায় ২ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। এ মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে আনুমানিক ৫৬ হাজার ২৫০ টন। এর আগের ২০২৪-২৫ মৌসুমে উপজেলায় আলুর উৎপাদন ছিল প্রায় ৩০ হাজার ৫০০ টন। অর্থাৎ এক মৌসুমের ব্যবধানে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
উপজেলায় বছরে আলুর স্থানীয় চাহিদা প্রায় ২০ হাজার টন। সেই হিসাবে চলতি মৌসুমে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর প্রায় ৩৬ হাজার ২৫০ টন আলু উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় আলুর দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতিও দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বর্তমান বাজারদরে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে। সাদুল্লাপুর শহরের খোলা বাজারে জাত ও মানভেদে প্রতি কেজি আলু ১৬ থেকে ১৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ১৫ থেকে ১৬ টাকাতেও আলু পাওয়া যাচ্ছে। ফলে উৎপাদক ও মজুতকারীরা যখন লোকসানের হিসাব করছেন, তখন তুলনামূলক কম দামে আলু কিনতে পারায় ভোক্তাদের মধ্যে স্বস্তি রয়েছে।
খুচরা বিক্রেতা আলমগীর হোসেন জানান, তিনি মহাজনের কাছ থেকে আলু কেনেন। মহাজন আবার গ্রামের পাইকারদের কাছ থেকে আলু সংগ্রহ করেন। কয়েক দফা হাতবদলের পর সেই আলু খুচরা বাজারে আসে। ফলে উৎপাদক বা মজুতকারীর পর্যায়ের দাম এবং খুচরা বাজারের দামের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।
সাধারণ ক্রেতা মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমানে বাজারে অন্যান্য অনেক সবজির তুলনায় আলুর দাম কম। তাই পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় আলু ব্যবহার করা সহজ হচ্ছে। তবে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লোকসানের খবর তাদের জন্য উদ্বেগের বিষয় বলেও তিনি মনে করেন।
তীলকপাড়া গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, টানা দুই মৌসুম ধরে আলুতে লোকসান হলে কৃষকদের মধ্যে এ ফসল চাষের আগ্রহ কমে যেতে পারে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় যদি বাজারদরে উঠে না আসে, তাহলে পরবর্তী মৌসুমে অনেকেই বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে ভবিষ্যতে আলুর উৎপাদন কমে বাজারে সরবরাহের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
ইসলামপুর গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় সরকারি উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যারা ধারদেনা করে আলু উৎপাদন বা সংরক্ষণ করেছেন, তারা পরপর লোকসানের মুখে পড়লে নতুন মৌসুমে বিনিয়োগ করতে সমস্যায় পড়বেন। কৃষকদের উৎপাদন ধরে রাখতে সহায়তা না করা হলে এর প্রভাব ভবিষ্যতে বাজারেও পড়তে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অপূর্ব ভট্টাচার্য জানান, স্থানীয় চাহিদার তুলনায় গত দুই মৌসুমে আলুর উৎপাদন অনেক বেশি হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলনও ভালো হয়েছে। ফলে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে বাজারে সরবরাহের চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সাদুল্লাপুরে জমির ধরন ও উৎপাদন সময়ের কারণে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কিছুটা বিলম্বে আলু বাজারে আসার বিষয়টিও দামের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, বর্তমান বাজারদরে ভোক্তারা স্বস্তিতে থাকলেও আলু মজুত করে রাখা কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি প্রণোদনার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। পাশাপাশি আলুর বাজার সম্প্রসারণের জন্য রপ্তানির সম্ভাবনাও কাজে লাগানো গেলে উৎপাদকরা উপকৃত হতে পারেন বলে তিনি মনে করেন।
সাদুল্লাপুরের বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে কম দামে আলু কিনে স্বস্তি পাচ্ছেন ভোক্তারা, অন্যদিকে একই পণ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ করে ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। বাজার ব্যবস্থাপনার এই বৈপরীত্যই স্থানীয় আলু অর্থনীতির বড় বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। উৎপাদন ব্যয়, সংরক্ষণ ব্যয়, বাজারে সরবরাহ এবং চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা না গেলে এক মৌসুমের ভালো ফলনও কৃষকের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
হিমাগারে পড়ে থাকা হাজার হাজার টন আলু তাই শুধু একটি পণ্যের মজুত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের বিনিয়োগ, ব্যবসায়ীর পুঁজি, শ্রমিকের আয় এবং স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। এখন বাজারদর কতটা ঘুরে দাঁড়ায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য কী ধরনের সহায়তা পাওয়া যায়, সেটিই সাদুল্লাপুরের আলু চাষিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।