নামজারিতে নতুন নিয়ম, জমির মালিকদের সতর্কতা জরুরি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২০ বার
নামজারিতে নতুন নিয়ম, জমির মালিকদের সতর্কতা জরুরি

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জমি কেনা, উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পাওয়া কিংবা পারিবারিকভাবে জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর শুধু দলিল রেজিস্ট্রি করেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে নামজারি বা মিউটেশন সম্পন্ন করাও গুরুত্বপূর্ণ। জমির মালিকানা সংক্রান্ত সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ রাখা, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ এবং ভবিষ্যতে জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নামজারির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণে জমির মালিকানা পাওয়ার পর নামজারির প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট নিয়ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।

সম্প্রতি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারি নিয়ে ভূমি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে। নতুন নিয়মে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর রেখে যাওয়া জমির সব বৈধ ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নামজারি করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে জমি ভাগ-বাটোয়ারা না হলে একজন বা একাধিক ওয়ারিশের নামে আলাদা খতিয়ান করার পরিবর্তে সব ওয়ারিশের নাম যৌথভাবে রেকর্ডে থাকবে।

এই ব্যবস্থায় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে সব ওয়ারিশের মালিকানা সরকারি রেকর্ডে নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে অন্যদের নামে পুরো সম্পত্তির নামজারি করার সুযোগ কমানোর লক্ষ্যেই এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। ফলে কোনো পরিবারের সদস্য বিদেশে থাকলেও, নারী ওয়ারিশ থাকলেও কিংবা একাধিক ভাই-বোনের মধ্যে সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে এলে প্রত্যেকের বৈধ অংশের বিষয়টি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন হবে।

নতুন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যৌথ নামজারির জন্য আলাদা বণ্টননামা দলিল বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ উত্তরাধিকারীরা যদি জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ না করেন এবং সবাই যৌথ মালিক হিসেবে রেকর্ডে থাকতে চান, তাহলে ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ভিত্তিতে যৌথ নামজারি করা যাবে। তবে উত্তরাধিকারীরা যদি নিজেদের অংশ আলাদা করে পৃথক খতিয়ান করতে চান, সেক্ষেত্রে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা আপস-বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন হবে।

সহজভাবে বললে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে প্রথমে সবাইকে যৌথভাবে রেকর্ডভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। পরে পরিবারের সদস্যরা পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পত্তি ভাগ করলে নিবন্ধিত বণ্টননামার মাধ্যমে পৃথক খতিয়ান করার পথ খোলা থাকবে। এতে একদিকে ওয়ারিশদের প্রাথমিক মালিকানা রেকর্ডে উঠে আসবে, অন্যদিকে জমির অংশ আলাদা করার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক দলিলের প্রয়োজনীয়তাও নিশ্চিত হবে।

নামজারি বলতে মূলত জমির সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করাকে বোঝায়। কেউ জমি কিনলে কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিক হলে আগের মালিকের পরিবর্তে নতুন মালিক বা ওয়ারিশদের নাম রেকর্ডে যুক্ত করার প্রক্রিয়াই নামজারি। বর্তমানে ভূমিসেবা ব্যবস্থার ডিজিটালায়নের ফলে অনলাইনের মাধ্যমেও নামজারির আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। নির্ধারিত কাগজপত্র ও ফি জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস আবেদনটি যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেয়।

নামজারি না করলে জমির মালিকানা নিয়ে ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম না থাকলে জমি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। একইভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তিতে কোনো একজন ওয়ারিশের নাম রেকর্ডে থাকলেও অন্যদের নাম না থাকলে পরবর্তী সময়ে অংশীদারদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই উত্তরাধিকার পাওয়ার পর সব বৈধ ওয়ারিশের তথ্য সঠিকভাবে রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন নিয়মের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে আবেদনের সময়। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির যৌথ নামজারির আবেদনে সব ওয়ারিশের তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে। প্রয়োজনীয় ওয়ারিশ সনদসহ অন্যান্য কাগজপত্রও যথাযথভাবে জমা দিতে হবে। কোনো বৈধ ওয়ারিশের নাম ভুলভাবে বাদ পড়লে পরবর্তী সময়ে সংশোধন বা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য অতিরিক্ত সময় ও প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বৈধ ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করে আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হয়। একই সঙ্গে মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ, পূর্ববর্তী খতিয়ান, জমির দাগ ও অন্যান্য মালিকানা-সংক্রান্ত নথিও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুত রাখা উচিত। কাগজপত্রে নাম, ঠিকানা, দাগ নম্বর বা জমির পরিমাণে অসঙ্গতি থাকলে আবেদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

আলাদা খতিয়ান করার ক্ষেত্রে নিয়মটি আরও স্পষ্ট। উত্তরাধিকারীরা যদি নিজেদের অংশ আলাদা করতে চান, তাহলে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বণ্টননামা প্রস্তুত করে তা নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধিত বণ্টননামার ভিত্তিতে প্রত্যেকের অংশ অনুযায়ী পৃথক খতিয়ান করার সুযোগ থাকবে। ফলে শুধু মৌখিকভাবে জমি ভাগ করে নিলেই সরকারি রেকর্ডে আলাদা মালিকানা প্রতিষ্ঠা হবে—এমন ধারণা থেকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

জমির মালিকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুরোনো নামজারি ও খতিয়ানের তথ্য যাচাই করা। আগে থেকেই কোনো জমির নামজারি সম্পন্ন হয়ে থাকলে একই কারণে নতুন করে নামজারি করার প্রয়োজন নেই, যদি সরকারি রেকর্ডে তথ্য সঠিক থাকে। তবে পুরোনো রেকর্ড বর্তমান ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থায় যথাযথভাবে সংরক্ষিত বা হালনাগাদ আছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া উপকারী। ভবিষ্যতে ভূমি উন্নয়ন কর, জমি হস্তান্তর বা অন্যান্য ভূমিসেবা গ্রহণের সময় রেকর্ডের অসঙ্গতি সমস্যার কারণ হতে পারে।

জমি কেনার পরও দ্রুত নামজারি করার বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার। দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে গেলেই সরকারি রেকর্ডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব পরিবর্তন হয়ে যায়—এমন ধারণা করা ঠিক নয়। ক্রেতাকে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নামজারির আবেদন করতে হবে এবং আবেদনের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ রাখতে হবে। একই সঙ্গে দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর, মৌজা ও জমির পরিমাণের তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।

বিশেষ করে উত্তরাধিকারী জমির ক্ষেত্রে পরিবারের সবাইকে নিয়ে আগেই আলোচনা করে নেওয়া অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে। কারা বৈধ ওয়ারিশ, কার কত অংশ এবং সবাই যৌথ মালিক হিসেবে থাকতে চান কি না—এসব বিষয়ে পারিবারিকভাবে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। কেউ যদি নিজের অংশ আলাদা করতে চান, তাহলে নিবন্ধিত বণ্টননামার মাধ্যমে সেটি আইনগত ও সরকারি রেকর্ডে প্রতিফলিত করার ব্যবস্থা করা উচিত।

নতুন নিয়মের ফলে একটি বড় পরিবর্তন হলো, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির সরকারি রেকর্ডে সব ওয়ারিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে কোনো একজন ওয়ারিশের নামে অন্যদের অজ্ঞাতে সম্পত্তির রেকর্ড তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে। একই সঙ্গে নারী ওয়ারিশসহ পরিবারের প্রত্যেক বৈধ উত্তরাধিকারীর অংশ সরকারি নথিতে দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে নিয়ম কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাস্তব কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক পরিবারের কোনো সদস্য বিদেশে থাকেন, কারও সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ থাকে না কিংবা পরিবারের সদস্যদের পরিচয় ও নথিপত্রে অসঙ্গতি থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের তথ্য সংগ্রহ করে নির্ভুলভাবে আবেদন করা সময়সাপেক্ষ হতে পারে। আবার আলাদা খতিয়ানের জন্য বণ্টননামা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় ও খরচের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জমির মালিকানা সংক্রান্ত কোনো তথ্য অনুমান করে বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্রের ভিত্তিতে নামজারি করা উচিত নয়। জমির পুরোনো দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর, ওয়ারিশ সনদ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথির তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার। কোনো বিরোধ বা অস্পষ্টতা থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে বিষয়টি যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে ভূমি আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

জমি বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু সম্পত্তি নয়, অনেক পরিবারের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, বসতভিটা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। তাই নামজারির মতো একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সামান্য ভুলও পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের বিরোধের কারণ হতে পারে। নতুন নিয়মে উত্তরাধিকারীদের যৌথভাবে রেকর্ডভুক্ত করার সুযোগ থাকায় পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মালিকানা সঠিকভাবে নথিভুক্ত করার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।

নামজারি সম্পন্ন করার পর খতিয়ানে নিজের নাম, অংশ, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণ সঠিকভাবে উল্লেখ আছে কি না, সেটিও যাচাই করা উচিত। কোনো ভুল ধরা পড়লে সময়মতো সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া নিরাপদ। একই সঙ্গে নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যতে জমি ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হতে পারে।

সামগ্রিকভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো আগে সব বৈধ ওয়ারিশের যৌথ মালিকানা সরকারি রেকর্ডে নিশ্চিত করা এবং পরে প্রয়োজন হলে নিবন্ধিত বণ্টননামার মাধ্যমে পৃথক মালিকানা প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া। তাই জমির মালিকদের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো কাগজপত্র সঠিক রাখা, সব ওয়ারিশের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা এবং যৌথ ও পৃথক নামজারির পার্থক্য পরিষ্কারভাবে বোঝা। সচেতনভাবে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করলে ভবিষ্যতের অনেক ভূমি বিরোধ ও প্রশাসনিক জটিলতা এড়ানো সম্ভব হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত