প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার একটি শরণার্থীশিবিরে বেড়ে ওঠা ১৩ বছরের কিশোরী রাঘাদের জীবন এবার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে পৌঁছে গেল বিশেষ স্বীকৃতির মঞ্চে। ফিলিস্তিনি নির্মাতা হোসাম আবু দানের ‘থার্টিন ইন গাজা’ জিতে নিয়েছে ৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের নেটপ্যাক পুরস্কার। একই উৎসবে দর্শকদের ভোটে পিপলস চয়েজ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে স্প্যানিশ নির্মাতা হাভিয়ের কালভো ও হাভিয়ের আমব্রোসির ‘লা বোলা নেগ্রা’।
রোববার ১১ দিনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, সংক্ষেপে টিআইএফএফ। শেষ দিনে লাইটবক্সে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। গাজার কিশোরীর জীবন ও যুদ্ধের বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রটির স্বীকৃতি উৎসবের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে উঠেছে।
‘থার্টিন ইন গাজা’ নির্মাতা হোসাম আবু দানের প্রথম কাহিনিচিত্র। মাত্র ৭৭ মিনিটের এই সিনেমায় গাজার একটি বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরে বাবার সঙ্গে বসবাস করা ১৩ বছরের রাঘাদের জীবনকে তুলে ধরা হয়েছে। কৈশোরে প্রবেশের সময় একজন কিশোরীর ব্যক্তিগত পরিবর্তন, নিরাপত্তাহীনতা, যুদ্ধের অভিঘাত এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই গল্পের মধ্যে স্থান পেয়েছে।
চলচ্চিত্রটির বিশেষত্ব হলো, এটি কেবল যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি। বরং যুদ্ধের মধ্যে বসবাস করা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক, ভয়, আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিগত অনুভূতিকেও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হয়েছে। পুরো সিনেমাটির শুটিং হয়েছে গাজায় এবং এতে স্থানীয় ফিলিস্তিনি কলাকুশলীরা কাজ করেছেন। টরন্টো উৎসবের সেন্টারপিস বিভাগে সিনেমাটির বিশ্ব উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়।
নেটপ্যাক জুরি ‘থার্টিন ইন গাজা’কে পুরস্কৃত করার কারণ হিসেবে জানিয়েছে, চলমান পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্রটি মানুষের দুর্ভোগকে শুধু প্রদর্শনীর বিষয় হিসেবে তুলে ধরেনি। বরং গাজার মানুষের জীবনের জটিলতা ও মানবিক অভিজ্ঞতাকে শক্তিশালী দৃশ্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে। জুরির ভাষ্যে, এটি একটি সাহসী ও জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র এবং এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি নতুন কণ্ঠের উপস্থিতি দেখা গেছে।
নেটওয়ার্ক ফর দ্য প্রমোশন অব এশিয়ান প্যাসিফিক সিনেমা বা নেটপ্যাকের এই পুরস্কার এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের চলচ্চিত্রের জন্য দেওয়া হয়। প্রথম বা দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন—এমন পরিচালকদের টিআইএফএফে প্রদর্শিত কাজের মধ্য থেকে একটি চলচ্চিত্রকে বেছে নেয় আন্তর্জাতিক জুরি। এবারের জুরির সভাপতি ছিলেন রোমের সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অধ্যয়নের সহযোগী অধ্যাপক মারা মাত্তা। জুরিতে আরও ছিলেন শিল্পী ও লেখক রিচার্ড ফাং এবং চলচ্চিত্র সমালোচক পানাইয়োতিস কোটজাথানাসিস।
পুরস্কার পাওয়ার পর নির্মাতা হোসাম আবু দান এক বিবৃতিতে বলেন, গাজার কণ্ঠ দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারা তাঁদের জন্য গভীর গর্বের বিষয়। গাজার অসংখ্য বেদনাদায়ক গল্পের মধ্য থেকে একটি মানুষের গল্প বিশ্বের দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পাওয়াকে তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।
গাজার বাস্তবতাকে একটি কিশোরীর চোখ দিয়ে দেখানোর কারণে সিনেমাটির মানবিক দিকটিও আলাদা করে নজর কেড়েছে। যুদ্ধের সংবাদে সাধারণত বিস্ফোরণ, ধ্বংসস্তূপ ও হতাহতের দৃশ্য সামনে আসে। কিন্তু ‘থার্টিন ইন গাজা’ সেই বৃহত্তর বাস্তবতার ভেতরে একজন কিশোরীর বেড়ে ওঠার গল্পকে কেন্দ্রে এনেছে। ব্যক্তিগত জীবনের ছোট ছোট সংকটের সঙ্গে যুদ্ধের বড় বাস্তবতা কীভাবে মিশে যায়, সেটিই সিনেমাটির অন্যতম প্রধান বিষয়।
এদিকে টিআইএফএফের মূল পিপলস চয়েজ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে ‘লা বোলা নেগ্রা’। ১৯৭৮ সাল থেকে উৎসবের দর্শকদের ভোটের ভিত্তিতে এই পুরস্কার দেওয়া হয়ে আসছে। এবারের উৎসবে দর্শকদের পছন্দের ছবিটি নির্মাণ করেছেন হাভিয়ের কালভো ও হাভিয়ের আমব্রোসি। তাঁদের চলচ্চিত্রের গল্প বিস্তৃত হয়েছে তিনটি সময়পর্বে—১৯৩২, ১৯৩৭ ও ২০১৭ সালে।
স্পেনের তিন পুরুষের জীবন, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ও যন্ত্রণাকে একই গল্পের সূত্রে যুক্ত করেছে ‘লা বোলা নেগ্রা’। টরন্টোর আগে কান চলচ্চিত্র উৎসবেও সিনেমাটি আলোচনায় আসে। সেখানে হাভিয়ের কালভো ও হাভিয়ের আমব্রোসি যৌথভাবে সেরা পরিচালকের পুরস্কার পান। পরবর্তী সময়ে সিনেমাটির স্বত্ব কিনে নেয় নেটফ্লিক্স।
তবে টরন্টোর পুরস্কার নেওয়ার সময় দুই নির্মাতা উপস্থিত ছিলেন না। তাঁরা তখন স্পেনে সিনেমাটির প্রচারণার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁদের পাঠানো বার্তা অনুষ্ঠানে পড়ে শোনান টিআইএফএফের প্রধান নির্বাহী ক্যামেরন বেইলি। নির্মাতারা জানান, ছবিটি তাঁদের জন্য অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটি কাজ। পরিচয় প্রকাশের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সিনেমাটিতে তুলে ধরা হয়েছে। টরন্টোর দর্শকেরা ছবিটির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক তৈরি করেছেন এবং সেটিকে আপন করে নিয়েছেন—এটিকেই তাঁরা সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্যও এবারের টিআইএফএফে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। থেজা রিও পরিচালিত ‘আং’ পেয়েছে প্ল্যাটফর্ম পুরস্কার। ভারত-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাগাল্যান্ডের একটি গ্রামের শেষ জীবিত প্রধানকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। এর বেশির ভাগ সংলাপ কোনিয়াক ভাষায়।
পুরস্কার পাওয়ার পর থেজা রিও জানান, নিজের জন্মভূমিকে ঘিরে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছা থেকেই তিনি কাজটি শুরু করেছিলেন। নিজের জনগোষ্ঠীর গল্প ও কণ্ঠস্বর তুলে ধরাই ছিল তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য। সেই চলচ্চিত্র নিয়ে টরন্টো এসে পুরস্কার পাওয়া তাঁর কাছে স্বপ্ন পূরণের মতো একটি ঘটনা।
‘আং’-এর পুরস্কারটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অস্কারের নতুন যোগ্যতা-সংক্রান্ত নিয়মের কারণে। প্রথমবারের মতো প্ল্যাটফর্ম পুরস্কারজয়ী অ-ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র অস্কারের সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। অবশ্য এর জন্য অস্কারের অন্যান্য নিয়মও পূরণ করতে হবে। ‘আং’-এর অধিকাংশ সংলাপ কোনিয়াক ভাষায় হওয়ায় ভাষাসংক্রান্ত শর্ত পূরণের সুযোগ রয়েছে।
উৎসবের শেষ দিনে আরও একটি আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় কানাডীয় নির্মাতা কোডি লাইটনিংয়ের বক্তব্যে। তাঁর ‘স্মাজ দ্য ব্লেডস’ জিতে নেয় বেস্ট কানাডিয়ান ডিসকভারি অ্যাওয়ার্ড। পুরস্কার গ্রহণের সময় নিজের প্রয়াত মায়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
কোডি জানান, কয়েক সপ্তাহ আগে আকস্মিকভাবে তাঁর মা জর্জিনা লাইটনিং মারা গেছেন। তিনিও একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন। মায়ের কথা স্মরণ করে কোডি বলেন, বাবার কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন রসবোধ, আর মায়ের কাছ থেকে গল্প বলার ক্ষমতা। এরপর তিনি জানান, এই পুরস্কার তাঁর মায়ের জন্য। ছবিটির শুটিংয়ের সময় তাঁর মা প্রায়ই সেটে থাকতেন এবং এই কাজ নিয়ে তিনি নিশ্চয়ই গর্বিত হতেন বলেও উল্লেখ করেন কোডি।
এবারের উৎসবে কানাডার সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে সারভিল পোবলেতের ‘সানবার্ন’। টরন্টোর ব্লিকার স্ট্রিট এলাকার একদল কিশোর-কিশোরীর বেড়ে ওঠার গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমাটিকে জুরি প্রাণবন্ত, মজার এবং মানবিক চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করেছে।
আন্তর্জাতিক পিপলস চয়েজ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে সাইমন স্টোনের ‘এলসিনোর’। প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে দর্শকদের পছন্দের পুরস্কার পেয়েছে ব্যারি অ্যাভরিচের ‘ডারলিন লাভ: আই নো হোয়্যার আই’ভ বিন’। আর মিডনাইট ম্যাডনেস বিভাগে দর্শকের পছন্দের সিনেমা হয়েছে ম্যাথিউ র্যানকিনের ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, ব্রায়ান মুলরনি’।
১১ দিনের এবারের টিআইএফএফে ৭২টি দেশের ২৯৪টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। উৎসবের ৯৮টি লালগালিচায় অংশ নিয়েছেন আট শতাধিক শিল্পী ও চলচ্চিত্রকর্মী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ২৭৯ জন পরিচালকও উৎসবে অংশ নেন। স্বীকৃত গণমাধ্যমকর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার। প্রথমবার চালু হওয়া ‘টিআইএফএফ: দ্য মার্কেট’-এ অংশ নেন প্রায় সাত হাজার প্রতিনিধি।
১০ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই চলচ্চিত্র উৎসব শেষ হয়েছে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের ব্যাপক উপস্থিতির মধ্য দিয়ে। পুরস্কার ঘোষণার পরও সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ হয়নি। দর্শকদের জন্য পিপলস চয়েজ পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্রগুলোর বিশেষ বিনা মূল্যের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। উৎসবের প্রধান নির্বাহী ক্যামেরন বেইলি দর্শকদের উপস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, টিআইএফএফের দর্শকভিত্তি আগের মতোই শক্তিশালী এবং এবার সেটি আরও শক্তিশালী হয়েছে।
সব মিলিয়ে এবারের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুধু তারকাখচিত আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। যুদ্ধের ভেতরে বেড়ে ওঠা এক কিশোরীর ব্যক্তিগত গল্প, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ, পরিচয় ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন, শোক ও পারিবারিক সম্পর্ক—বিভিন্ন মানবিক অভিজ্ঞতা জায়গা করে নিয়েছে উৎসবের পুরস্কারের তালিকায়। গাজার ‘থার্টিন ইন গাজা’র স্বীকৃতি সেই বৈচিত্র্যের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে থাকল।