হামলা হলে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি ইরানের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
হামলা হলে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি ইরানের

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। তেহরানের সামরিক কমান্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে নতুন করে হামলা চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থে পাল্টা আঘাত হানা হবে। একই সঙ্গে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড বা স্থাপনা ব্যবহার করে ইরানে হামলার সুযোগ দেবে, তাদেরও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হবে বলে সতর্ক করেছে ইরান।

রোববার ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর তদারককারী খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের পক্ষ থেকে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। সামরিক কমান্ডটি দাবি করেছে, তারা এমন তথ্য পেয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা ওয়াশিংটন দেয়নি। ফলে তেহরানের এই দাবি এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইরানের সামরিক কমান্ডের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, দেশটির বিরুদ্ধে নতুন কোনো মার্কিন হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থগুলো পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, যেসব আঞ্চলিক দেশ ওয়াশিংটনের সামরিক তৎপরতাকে সহায়তা করবে, তাদেরও সংঘাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান। এতে সম্ভাব্য সংঘাত শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি বলে জানিয়েছেন। রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরান নিয়ে সামরিক পদক্ষেপ, অর্থনৈতিক চাপ অথবা একটি চুক্তিতে পৌঁছানো—বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় নিউইয়র্কে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি।

এই পরিস্থিতিতে সামরিক হুমকির পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। একই সময়ে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনার পথ খোঁজার চেষ্টা চলছে। কাতার দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে ভূমিকা রাখছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে আলোচনা পুনরায় শুরু করার ক্ষেত্রে তেহরানের কয়েকটি শর্ত রয়েছে। ইরান যুদ্ধ ও মার্কিন হামলা বন্ধের পাশাপাশি জব্দ থাকা অর্থ ছাড় এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। এসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান অনড় অবস্থানে রয়েছে বলে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই জলপথ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। সংঘাতের কারণে সেখানে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ১৭টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে, যেখানে আগের সপ্তাহে এই সংখ্যা ছিল ৩৭টি। যুদ্ধের আগে এই পথে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২৫টি জাহাজ চলাচল করত।

জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে তেল রপ্তানি অব্যাহত থাকলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বড় জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের মতো বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়; বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনীতি এই জলপথের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ এটি। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব জ্বালানি মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মার্কিন সামরিক উপস্থিতি। উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও সেনা উপস্থিতি রয়েছে। ইরানের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায় এসব ঘাঁটি ও মার্কিন স্বার্থকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে নতুন করে হামলা শুরু হলে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি কতটা বাড়তে পারে, তা নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের হুমকির পর যুক্তরাষ্ট্রও মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে এবং সম্ভাব্য দ্রুত উত্তেজনা বৃদ্ধি, বিমান চলাচলে বিঘ্ন ও আকাশসীমা বন্ধের ঝুঁকির কথা জানিয়েছে।

এদিকে তেহরানের ভেতরেও সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে একাধিক বার্তা সামনে আসছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, চাপ মোকাবিলায় সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও প্রয়োজন। অর্থাৎ একদিকে সম্ভাব্য নতুন হামলার জন্য প্রস্তুতির কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে আলোচনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। এই দ্বিমুখী অবস্থান থেকেই বোঝা যাচ্ছে, সংঘাতের পরবর্তী পর্যায় সামরিক পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ—দুই দিকেই এগোতে পারে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সামনে থাকায় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনে কোনো নতুন উদ্যোগ আসে কি না, সেদিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বৈঠকের কোনো সুযোগ তৈরি হলে তা ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য নতুন পথ খুলতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত দুই পক্ষের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে একই সঙ্গে দুটি বিপরীত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একদিকে ইরান সম্ভাব্য মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিয়ে অর্থনৈতিক চাপ ও আলোচনার পথও খোলা রাখছে। এর পাশাপাশি কাতার ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো মধ্যস্থতার মাধ্যমে আলোচনার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।

এ অবস্থায় নতুন করে সামরিক হামলা হলে তা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশ ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথও সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে চলে আসবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে। ফলে আগামী দিনগুলোতে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অনেকটাই নির্ভর করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত