প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে প্রতি লিটারে ১৪ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি দেশের জ্বালানি তেলের দাম, গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন।
রিজভীর বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বেড়েছে।
নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার দিনই রিজভী বলেন, দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে প্রতি লিটারে ১৪ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকির বিষয়টি সামনে আনেন। তবে তিনি যে ১৪ টাকা ভর্তুকির হিসাবের কথা বলেছেন, তার বিস্তারিত ভিত্তি বা কোন ধরনের জ্বালানির ক্ষেত্রে এই হিসাব প্রযোজ্য, তা বক্তব্যে স্পষ্ট করেননি।
রিজভী একই সঙ্গে বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম এখনো কম। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের বর্তমান মূল্য নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ফলে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েও জনজীবনে নানা আলোচনা চলছে।
সরকারের নতুন মূল্য নির্ধারণের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন দামে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের দামও এক ধাপে ২০ টাকা বেড়েছে। ফলে পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে কৃষি ও বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা নিয়ে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে রিজভী বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প কোনো প্রস্তাব না দিয়ে বিরোধী দল লংমার্চের কর্মসূচি দিচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধী পক্ষের বক্তব্যের ধরন সমীচীন নয়। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট মোকাবিলায় সরকার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতি হলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, বিদ্যুতের সংকট তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়ে। আবার জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যেতে পারে। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত শুধু পাম্পে গিয়ে ভোক্তার দেওয়া দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও রিজভী তাঁর বক্তব্যে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী পক্ষের কিছু কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। তাঁর দাবি, বিএনপি এ ধরনের পরিস্থিতিতে নীরব থাকবে না। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো করে কর্মসূচি প্রতিহত করবে না; বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রিজভী আরও বলেন, পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টার বিরুদ্ধে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো মিছিল, সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলের পক্ষ থেকে সাংগঠনিকভাবে এসব কর্মসূচি নেওয়া হবে।
প্রশাসনের ভেতর থেকেও কেউ কেউ অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। তবে তাঁর বক্তব্যে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বা সরকারের কোনো বক্তব্য থাকলে তা-ও পরিস্থিতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এর আগে বিএনপির পক্ষ থেকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দলীয় কর্মসূচি নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ যৌথসভাতেও দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো এবং পরিকল্পিত সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা ও পাল্টা বক্তব্যও দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নতুন মূল্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এখন শুধু অর্থনৈতিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাজনৈতিক আলোচনারও গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ও দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য সমন্বয়ের কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বাড়বে এবং বাজারে এর প্রভাব কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয়।
রিজভীর ১৪ টাকা ভর্তুকির বক্তব্যও সেই বৃহত্তর বিতর্কের অংশ। জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং সরকারি ভর্তুকির বিষয়গুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে ভবিষ্যতে তেলের দাম কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে কতটা চাপ বহন করবে, তা অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
সব মিলিয়ে, নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বিএনপির পক্ষ থেকে রুহুল কবির রিজভীর দেওয়া বক্তব্যে একদিকে সরকারের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, অন্যদিকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও দলের অবস্থান জানানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের নতুন দাম ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। এখন এর প্রভাব পরিবহন, পণ্যবাজার, উৎপাদন ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচে কতটা পড়ে, সেদিকেই নজর থাকবে।