প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুদ্দোহা সরকার আদালতে এই রিমান্ড আবেদন করেন। মামলাটি ঘিরে নিহত মরিয়মের পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকে তাঁকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ বলছে, ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, গত জুন মাসে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী বিয়ে হয়। বিয়ের পর মরিয়ম সংসদ সদস্যের সঙ্গে শেরেবাংলা নগর থানার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসংলগ্ন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। ওই বাসায় সংসদ সদস্যের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামও থাকতেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই নানা বিষয় নিয়ে মরিয়মের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে মুঠোফোনে কথা বলার সময় মরিয়ম এসব বিষয়ে তাঁদের জানিয়েছিলেন বলেও এজাহারে দাবি করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনি যে পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন, তা নিয়ে স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে ২০ সেপ্টেম্বর বিকেলে। এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল ইসলাম মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহকে ফোন করে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। খবর পেয়ে তিনি মরিয়মের খালা সুফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ন্যাম ভবনের ওই বাসায় যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা বাসার আশপাশে লোকজনের ভিড় দেখতে পান।
পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, মরিয়ম যে কক্ষে ছিলেন, সেটির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। পরে জানালা দিয়ে তাঁকে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় ঝুলতে দেখা যায়। পরিস্থিতি দেখে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশের উপস্থিতিতে গণপূর্ত বিভাগের একজন কর্মী শাবল দিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার আগে ও পরে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং এতে কারও প্ররোচনা বা অন্য কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
মরিয়মের বিছানা থেকে একটি হাতে লেখা চিঠি উদ্ধারের কথাও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, ওই চিঠিতে বিশ্বাসভঙ্গ, মানসিক কষ্ট এবং সম্পর্কের টানাপড়েনের বিষয় উঠে এসেছে। চিঠিটি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে চিঠির বক্তব্য, এর প্রেক্ষাপট এবং এটি মরিয়মের নিজের লেখা কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানের প্ররোচনার মাধ্যমে মরিয়মের সঙ্গে নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়েছিল। এরপর সংসারে নানা জটিলতা তৈরি হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের ধারাবাহিক নির্যাতন এবং অন্য আসামিদের প্ররোচনার কারণে মরিয়ম শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
তবে মামলায় আনা অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হলেও রিমান্ড মঞ্জুর হবে কি না, সে বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। একই সঙ্গে অভিযোগের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা তদন্তে প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
একজন নারীর আকস্মিক মৃত্যু শুধু একটি মামলার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, প্রত্যাশা, উদ্বেগ এবং শোক। মরিয়মের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তাঁর স্বজনদের মধ্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, মামলার বর্ণনা থেকে তার একটি চিত্র পাওয়া যায়। পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে তিনি তাঁদের কাছে নিজের কষ্টের কথা জানিয়েছিলেন। এখন সেই কথাগুলোর সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের ফল, উদ্ধার করা চিঠি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখার অপেক্ষা রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে সাধারণত কোনো মৃত্যুর ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্য, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই মামলাতেও এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে ঘটনার ধারাবাহিকতা নির্ধারণ করা হবে। বিশেষ করে মৃত্যুর আগে মরিয়মের সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন, তাঁর সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছিল এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাশাপাশি গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানের ভূমিকার কথাও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগ এবং প্রমাণ এক বিষয় নয়; তদন্তে পাওয়া তথ্য ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
এদিকে সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের পর মামলাটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পুলিশ আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি, পারিবারিক সম্পর্কের টানাপড়েন এবং মরিয়মের মৃত্যুর সঙ্গে কোনো ধরনের প্ররোচনা বা নির্যাতনের যোগসূত্র ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে চাইছে। আদালতের সিদ্ধান্তের পর তদন্তের পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে যাবে।
মরিয়মের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তাঁর পরিবার যেমন ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে, তেমনি পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য নির্ধারণ করাই আইনগত প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, উদ্ধার করা চিঠি, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য আলামত তদন্তকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।