প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ফারুক হোসেন হত্যা মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পাসহ তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় আরও চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর দুপুরে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামিকে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অর্থদণ্ড অনাদায়ে প্রত্যেককে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। মামলার আরেক আসামি সঞ্জিত ঘোষকে অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
রায় ঘোষণার সময় মামলাটি ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিচারিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব শেষ হয়। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলে মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে জানা গেছে। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামির মধ্যে দুজন কারাগারে রয়েছেন এবং বাকি দুজন পলাতক।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর ভোরে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার আকুরটাকুর বটতলা বাজার এলাকায় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ফারুক হোসেনকে হত্যা করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, একদল সন্ত্রাসী তাকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। ওই হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দেয়।
ঘটনার পরদিন নিহত ফারুক হোসেনের ছোট ভাই লাভলু মিয়া বাদী হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার পর ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। তবে ওই অভিযোগপত্রের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আদালতে নারাজি আবেদন করেন মামলার বাদী লাভলু মিয়া। পরে আদালতের নির্দেশে মামলাটির পুনঃতদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি।
পুনঃতদন্তের পর ২০১৮ সালের ২৯ এপ্রিল টাঙ্গাইল সিআইডি আদালতে নতুন করে অভিযোগপত্র জমা দেয়। সেখানে আগের আট আসামির বিরুদ্ধেই অভিযোগ আনা হয়। এরপর মামলাটি টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারিক পর্যায়ে যায়। অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া শেষে মামলাটির রায় ঘোষণার পর্যায়ে আসে।
সোমবার দুপুরে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত দায়রা জজ মো. ফয়সাল আল মামুন মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে টাঙ্গাইল শহরের কলেজপাড়া এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খানের ছেলে এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা, সদর উপজেলার কাগমারা এলাকার আফজাল ফকিরের ছেলে মো. আজাদ এবং দাইন্যা এলাকার শহীদ মিয়ার ছেলে শাহজাহানকে। রায় ঘোষণার সময় তাদের কেউ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গেছে।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া চারজন হলেন সদর উপজেলার যোগনী এলাকার লতিফ মিয়ার ছেলে মো. সুজন, দাইন্যা এলাকার রওশন আলীর ছেলে ছানোয়ার হোসেন, চর কাগমারা এলাকার মো. নুরুল ইসলামের ছেলে শফিকুল ইসলাম এবং ছিটকী বাড়ি এলাকার নুর বক্সের ছেলে রুজবেল। তাদের মধ্যে সুজন ও ছানোয়ার বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। শফিকুল ইসলাম ও রুজবেল পলাতক রয়েছেন। মামলার আরেক আসামি দাইন্যা এলাকার অমূল্য ঘোষের ছেলে সঞ্জিত ঘোষকে আদালত খালাস দিয়েছেন।
মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লেগেছে এক দশকেরও বেশি। ২০১৩ সালের হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম তদন্তে অভিযোগপত্র জমা পড়লেও বাদীর নারাজি আবেদনের পর মামলাটি পুনঃতদন্তের পর্যায়ে যায়। সিআইডির পুনঃতদন্ত শেষে ২০১৮ সালে আবার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরপর অভিযোগ গঠন করে আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণসহ বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আইনি প্রক্রিয়ার পর অবশেষে সোমবার রায় ঘোষণা করা হলো।
আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মো. সাইদুর রহমান স্বপনের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর ভোরে আকুরটাকুর বটতলা বাজার এলাকায় ফারুক হোসেনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের পর তার ভাই মামলা করেন এবং তদন্তের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন ছিল।
একজন জনপ্রতিনিধির হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের ওপরই নয়, স্থানীয় সমাজেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। ফারুক হোসেনের হত্যার পর তার পরিবারকে দীর্ঘদিন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। মামলার তদন্ত, পুনঃতদন্ত, অভিযোগপত্র, নারাজি আবেদন এবং আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ—সব মিলিয়ে বিচারপ্রক্রিয়াটি দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে। সোমবারের রায় সেই দীর্ঘ আইনি পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাপ্তি হিসেবে এসেছে।
তবে আদালতের রায় ঘোষণার পরও মামলাটির আইনগত প্রক্রিয়া এখানেই শেষ নাও হতে পারে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের আগে উচ্চ আদালতে বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ থাকে। একইভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আইন অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন। ফলে নিম্ন আদালতের রায়ের পর মামলাটি পরবর্তী আইনি ধাপেও যেতে পারে।
দীর্ঘদিন আগে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের মামলায় সোমবারের রায় স্থানীয়ভাবে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিহতের পরিবার দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর আদালতের সিদ্ধান্ত পেলেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কয়েকজন পলাতক থাকায় রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে কারাগারে থাকা দণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রেও আইন অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের এক যুগেরও বেশি সময় পর আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচারিক কার্যক্রম শেষে দণ্ডের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। রায়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড, চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং একজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। এখন দণ্ডপ্রাপ্তদের আইনগত পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের ওপরই মামলাটির পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করবে।