ধীরগতিতে ঢাকা-সিলেট ছয় লেন, ২০২৯ ঘিরে আশাবাদ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
ধীরগতিতে ঢাকা-সিলেট ছয় লেন, ২০২৯ ঘিরে আশাবাদ

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার বহুল প্রত্যাশিত প্রকল্পে ধীরগতির কারণে দীর্ঘ হচ্ছে মানুষের অপেক্ষা। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের হবিগঞ্জ অংশে ৮২ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের কাজ গত পাঁচ বছরে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের মতো এগিয়েছে। কোনো কোনো অংশে অগ্রগতির হার এর চেয়েও কম। জমি অধিগ্রহণ, বিদ্যুতের খুঁটি ও অন্যান্য পরিষেবা লাইন স্থানান্তর, ঠিকাদারি কাজের গতি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে ধীরগতির এই বাস্তবতার মধ্যেও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার বিষয়ে আশাবাদী। তাদের প্রত্যাশা, বাধাগুলো কাটিয়ে নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া গেলে ২০২৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ছয় লেনের সড়কে যান চলাচল শুরু করা সম্ভব হবে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকল্পের কাজ দ্রুত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দেশের রাজধানীর সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান পথ। শুধু ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে যাতায়াত নয়, এই সড়ক দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই করিডরের গুরুত্ব রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কটি প্রশস্ত ও আধুনিক করার দাবি ছিল সাধারণ মানুষ, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের।

এই গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। শুরুতে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সাল পর্যন্ত ধরা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ভূমি অধিগ্রহণের অগ্রগতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে না থাকায় অনেক স্থানে ঠিকাদাররা প্রয়োজনীয় জায়গা হাতে পাননি। ফলে নির্মাণকাজও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

হবিগঞ্জ অংশে প্রকল্পের ৮২ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এই অংশের বিভিন্ন জায়গায় একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ না থাকায় নির্মাণকাজের অগ্রগতিতে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কোনো অংশে তুলনামূলকভাবে কাজ এগিয়েছে, আবার কোথাও জমি অধিগ্রহণ বা অন্যান্য জটিলতার কারণে কাজ ধীরগতিতে চলছে।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক-৫ ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ গিয়াস উদ্দিন জানিয়েছেন, বাহুবল উপজেলার ডুবাঐ বাজার থেকে শেরপুর পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কিলোমিটার অংশে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। শুরুতে জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে কাজের গতি কম ছিল। বর্তমানে সেখানে কাজের গতি বাড়ানো হয়েছে। এই অংশে প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

অন্যদিকে মাধবপুর উপজেলার আল-আমিন হোটেল এলাকা থেকে বাহুবল উপজেলার ডুবাঐ বাজার পর্যন্ত প্রায় ৩৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার অংশে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক-৪ ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম শামসুজ্জোহা জানিয়েছেন, যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজে অতিরিক্ত ধীরগতি দেখা যাচ্ছে, তাদের সতর্ক করে নোটিশ দেওয়া হবে। এরপরও কাজের গতি না বাড়লে চুক্তি বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রয়োজনীয় নোটিশ পাঠানোর কথাও জানিয়েছেন তিনি।

হবিগঞ্জের আরেকটি অংশে নির্মাণকাজের অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি। উপপ্রকল্প পরিচালক মো. রোকনুজ্জামান জানিয়েছেন, মাধবপুরের শুরুর অংশ থেকে জগদীশপুর পর্যন্ত প্রায় ১৯ কিলোমিটার সড়কের কাজ একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করছে। এই অংশে প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে জমি অধিগ্রহণ এবং বিদ্যুতের খুঁটি সরানোর কাজের কারণে নির্মাণকাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে।

এই অংশে শুধু মূল সড়ক নির্মাণ নয়, বিভিন্ন অবকাঠামোও তৈরি করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ২৬টি কালভার্ট ও সাতটি সেতু নির্মাণের কাজ রয়েছে। এসব অবকাঠামোর কাজ শেষ হলে মহাসড়কের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে মূল সড়কের নির্মাণের সঙ্গে এসব কাজের সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রকল্পের ধীরগতির সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে। মহাসড়ক সম্প্রসারণের জন্য নির্ধারিত জায়গা পুরোপুরি প্রকল্প কর্তৃপক্ষের হাতে না আসায় অনেক স্থানে নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। জমির মালিকানা, ক্ষতিপূরণ, জমির শ্রেণি এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে ঠিকাদারদের হাতে পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র না থাকায় নির্মাণকাজও স্বাভাবিক গতিতে এগোয় না।

সড়ক নির্মাণের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিষেবা অবকাঠামো স্থানান্তরের বিষয়টিও জড়িত। একটি মহাসড়ক প্রশস্ত করার সময় রাস্তার সীমানায় থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটি, বিভিন্ন পরিষেবা লাইন ও অন্যান্য স্থাপনা সরাতে হয়। এগুলো যথাসময়ে সরানো না গেলে নির্মাণকাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। হবিগঞ্জ অংশেও এ ধরনের সমস্যার কারণে কয়েকটি এলাকায় কাজের গতি কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ভূমি অধিগ্রহণ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. এসএম সরফরাজ জানিয়েছেন, জেলার অংশে জমি অধিগ্রহণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। জমি অধিগ্রহণের জটিলতা শেষ হয়ে গেলে সড়কের নির্মাণকাজও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

মহাসড়কের বর্তমান অবস্থার কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীরা। হবিগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী বাসচালক সিরাজুল ইসলামের অভিজ্ঞতায় সেই দুর্ভোগের চিত্র উঠে এসেছে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কের উন্নয়নকাজ চললেও কখন পুরো প্রকল্প শেষ হবে, তা নিয়ে যাত্রী ও চালকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ হলে যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি সড়কে চলাচলের ঝুঁকিও কমবে বলে তিনি মনে করেন।

একটি মহাসড়কের নির্মাণকাজ চলমান থাকলে স্বাভাবিকভাবেই যানবাহন চলাচলে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। কোথাও নির্মাণসামগ্রী রাখা, কোথাও অসমাপ্ত সড়ক, আবার কোথাও পুরোনো সড়কের ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল—সব মিলিয়ে চালকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। বিশেষ করে ভারী যানবাহন ও দূরপাল্লার বাসগুলোর ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সঙ্গে দেশের আঞ্চলিক অর্থনীতিরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সিলেট অঞ্চলের পণ্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিবহন, আবার রাজধানী ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সড়ক গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটন, ব্যবসা, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং আন্তঃজেলা যাতায়াতেও মহাসড়কটির ভূমিকা রয়েছে। ফলে ছয় লেন প্রকল্প শেষ হলে শুধু যাতায়াতের সময় কমবে না, পণ্য পরিবহন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

আঞ্চলিক যোগাযোগের দিক থেকেও এই মহাসড়ককে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও দেশের প্রধান সড়ক করিডরগুলোর উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সে বিবেচনায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আধুনিকায়ন শুধু একটি আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং বৃহত্তর যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

তবে প্রকল্পের বাস্তব সুফল পেতে হলে নির্মাণকাজের গতি বাড়ানো জরুরি। পাঁচ বছর পরও হবিগঞ্জ অংশে গড়ে এক-তৃতীয়াংশের মতো কাজ শেষ হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—কবে শেষ হবে এই দীর্ঘ নির্মাণযাত্রা। প্রকল্প কর্মকর্তাদের ২০২৯ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের আশ্বাস তাই বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

সম্প্রতি প্রকল্পের বিভিন্ন বাধা দ্রুত সমাধান করে কাজের গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেখানে ঠিকাদারদের কাজ ধীরগতিতে চলছে, সেখানে সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জমি অধিগ্রহণ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে নির্মাণকাজে গতি আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

ঢাকা-সিলেট ছয় লেন প্রকল্পের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে পরিকল্পনা অনুযায়ী জমি বুঝে পাওয়া, ঠিকাদারদের দ্রুত ও মানসম্মত নির্মাণকাজ, পরিষেবা লাইন স্থানান্তর এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের ওপর। শুধু নির্ধারিত সময় ঘোষণা করলেই প্রকল্প শেষ হবে না; মাঠপর্যায়ে প্রতিটি বাধা দ্রুত সমাধান করাও প্রয়োজন।

হবিগঞ্জের মানুষ ও মহাসড়কে নিয়মিত চলাচলকারী পরিবহন শ্রমিকদের প্রত্যাশা একটাই—দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হোক। নিরাপদ, প্রশস্ত ও আধুনিক সড়কে কম সময়ে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হোক। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বর্তমান আশাবাদ অনুযায়ী ২০২৯ সালের মাঝামাঝি যদি ছয় লেনের সড়কে যান চলাচল শুরু করা সম্ভব হয়, তাহলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসানের পাশাপাশি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসার সুযোগ তৈরি হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত