প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও আচরণ নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার পর। একজন জনপ্রতিনিধির সংসদের বাইরে ব্যক্তিগত আচরণ, নৈতিক দায়িত্ব, স্বার্থের সংঘাত এবং জবাবদিহির জন্য আলাদা কোনো পূর্ণাঙ্গ আইন বা বাধ্যতামূলক আচরণবিধি থাকা উচিত কি না—এই প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে সংসদের ভেতরে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও আচরণের বিভিন্ন বিষয় নির্ধারিত থাকলেও সংসদের বাইরে তাঁদের নৈতিক আচরণ ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণে একটি স্বতন্ত্র আইন এখনো কার্যকর হয়নি। অতীতে এ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে দুটি বেসরকারি বিল আনা হয়েছিল। একটি ২০০৩ সালে এবং অন্যটি ২০১০ সালে উত্থাপিত হলেও কোনোটি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয়নি।
গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। গত জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সঙ্গে এক তরুণীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। পরে গাজী নজরুল ওই তরুণীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বলে জানান। এরপর জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক তদন্তের কথা জানিয়ে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়।
এরই মধ্যে গত ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকার সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলাটি পরে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে তদন্তের জন্য হস্তান্তর করা হয়।
এই মামলায় গাজী নজরুল প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ডে ছিলেন। ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে আবার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চায় ডিবি। আদালত ওই দিন তাঁকে আরও চার দিনের রিমান্ডে পাঠায়। গাজী নজরুল অবশ্য আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং মরিয়ম নিজেই আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করেছেন। ফলে মামলার অভিযোগ, আসামিপক্ষের বক্তব্য এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের মধ্যে চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণ এখন আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়।
এই ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের নৈতিক আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনাও নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংসদ সদস্যরা শুধু আইন প্রণয়নকারী নন, তাঁরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাঁদের আচরণ, স্বার্থের সংঘাত, সরকারি সম্পদ ব্যবহার, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো থাকলে জবাবদিহির ক্ষেত্র আরও নির্দিষ্ট হতে পারে।
বাংলাদেশে এ ধরনের আইন করার উদ্যোগ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০০৩ সালে তৎকালীন বিএনপির সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান ‘দ্য মেম্বার অব পার্লামেন্ট (কোড অব কনডাক্ট) বিল-২০০৩’ নামে একটি বেসরকারি বিলের নোটিশ দিয়েছিলেন বলে সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিলটি সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানোর পর আর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
এর কয়েক বছর পর ২০১০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী ‘সংসদ সদস্য আচরণ বিল, ২০১০’ নামে আরেকটি বেসরকারি বিল আনেন। বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০১১ সালের মার্চে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি তা পাসের জন্য সুপারিশও করেছিল। কিন্তু নবম সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সেটিও আইনে পরিণত হয়নি।
২০১০ সালের প্রস্তাবিত বিলটিতে সংসদ সদস্যদের নৈতিক অবস্থান, দায়িত্ব ও কর্তব্য, স্বার্থের সংঘাত, আর্থিক তথ্য এবং উপহার গ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ ছিল। এসব বিষয় তদারকির জন্য একটি সংসদীয় নৈতিকতা কমিটির মতো কাঠামোর প্রস্তাবও ছিল। উদ্দেশ্য ছিল সংসদ সদস্যদের আচরণে একটি নির্দিষ্ট নৈতিক মানদণ্ড তৈরি করা এবং অভিযোগ উঠলে তা পর্যালোচনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এরপরও বিষয়টি পুরোপুরি অমীমাংসিত থাকেনি। ২০১২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলেও সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি প্রণয়নের লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর আইন প্রণয়ন হয়নি।
পরবর্তী সময়ে সংসদ ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে আলোচনাতেও জনপ্রতিনিধিদের আচরণ ও জবাবদিহির বিষয়টি এসেছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সংসদ সদস্যদের আচরণসংক্রান্ত আইন করার সুপারিশ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি জুলাই জাতীয় সনদেও সংসদের কমিটি ও সদস্যদের বিশেষ অধিকার, সেই অধিকারের সীমা এবং দায় নির্ধারণের বিষয়ে সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সংসদ সদস্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে। ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, ভুটান ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণবিধি বা কোড অব কন্ডাক্ট রয়েছে। এসব দেশের কাঠামো একে অপরের মতো নয়; কোথাও সংসদীয় নৈতিকতা কমিটি রয়েছে, কোথাও আর্থিক স্বার্থ প্রকাশের বাধ্যবাধকতা, আবার কোথাও উপহার গ্রহণ, স্বার্থের সংঘাত ও সংসদীয় সুবিধা ব্যবহারের বিষয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
বাংলাদেশে এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন কি না, সে প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে মতামত রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে। গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর সংস্থাটি জনপ্রতিনিধিদের জন্য বিশেষায়িত ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধির প্রয়োজনীয়তার কথা নতুন করে জানিয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সংসদ সদস্যদের নৈতিক স্খলনের বিষয়টি অতীতেও বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যম প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কিন্তু সেগুলোর প্রতিকারে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি রয়েছে এবং বাংলাদেশেও এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন।
জাতীয় সংসদের বর্তমান চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি অবশ্য জানিয়েছেন, সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণবিধি করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট আলোচনা হয়নি। তবে সবাই চাইলে এমন আচরণবিধি হতে পারে বলে তিনি মত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে জনপ্রতিনিধিদের সামাজিক ও নৈতিক ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
আচরণবিধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর আওতা ও প্রয়োগ। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না; আচরণবিধিতে কোন আচরণ নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ হবে, স্বার্থের সংঘাত কীভাবে প্রকাশ করতে হবে, আর্থিক স্বচ্ছতার মানদণ্ড কী হবে এবং অভিযোগের তদন্ত ও শাস্তির প্রক্রিয়া কী হবে—এসব বিষয় স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক অধিকার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নৈতিক বিধিনিষেধের ভারসাম্যও বিবেচনায় নিতে হবে।
অতীতে টিআইবির একটি গবেষণায় নবম সংসদের ১৪৯ জন সদস্যের মধ্যে ১৪৪ জনের বিরুদ্ধে এক বা একাধিক নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ বা তথ্য উঠে এসেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রশাসনিক কাজে প্রভাব বিস্তার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন বরাদ্দের অপব্যবহার, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রভাব এবং নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের মতো বিষয় ছিল। তবে ওই গবেষণার সময়কাল ও পরিধি বিবেচনা করে এসব পুরোনো তথ্যকে বর্তমান সংসদের সদস্যদের আচরণের সরাসরি প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা যায় না।
গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে চলমান মামলাটিও এখন তদন্তাধীন। তাঁর বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাই এই মামলার ফলাফল বা অভিযোগের সত্যতা নিয়ে আগাম কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তাঁর দলীয় বহিষ্কার এবং সংসদ সদস্য পদ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোও রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বিষয়।
তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বৃহত্তর প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য সংসদের বাইরে নৈতিক আচরণ ও জবাবদিহির একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রয়োজন কি না। অতীতের দুটি বেসরকারি বিল, পরবর্তী সংস্কার প্রস্তাব এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সুপারিশ দেখায় যে বিষয়টি বহু বছর ধরে আলোচনায় রয়েছে। বর্তমান বিতর্ক সেই পুরোনো প্রশ্নকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে—সংসদ সদস্যদের অধিকার ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে তাঁদের দায়িত্ব, নৈতিকতা ও জবাবদিহির সীমারেখা কীভাবে আরও স্পষ্ট করা যায়।
শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো নতুন আইন বা আচরণবিধি হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংসদীয় আলোচনা, রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার ওপর। গাজী নজরুলকে ঘিরে চলমান ঘটনাও তার নিজস্ব আইনগত প্রক্রিয়ায় এগোবে। তবে সাম্প্রতিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের আচরণ, নৈতিক দায়িত্ব ও জনজবাবদিহি নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনাটি আবার জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পেয়েছে।