প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর পৌরসভার পাঁচটি শূন্য পদে জনবল নিয়োগের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে অনাপত্তি ও ছাড়পত্র পাওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়নি। এতে চাকরিপ্রার্থী ও স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ নেই এবং নির্ধারিত বিধি ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পুরো কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের গত ৯ আগস্টের একটি চিঠির মাধ্যমে নবীনগর পৌরসভার আর্থিক সক্ষমতা ও জনবলের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় পাঁচটি শূন্য পদে ছয় মাস মেয়াদে জনবল নিয়োগের জন্য অনাপত্তি ও ছাড়পত্র দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট পদগুলো হলো নকশাকার, সহকারী কর নির্ধারক, সহকারী কর আদায়কারী, সহকারী লাইসেন্স পরিদর্শক এবং বিদ্যুৎমিস্ত্রি। ছাড়পত্র পাওয়ার পর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা হয়নি।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে বিলম্বের বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চাকরিপ্রার্থীদের একটি অংশের প্রশ্ন, সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পরও কেন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে এত সময় লাগছে। বিশেষ করে পৌরসভার শূন্য পদে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ার পর অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী আবেদন করার প্রস্তুতি নিতে পারেন। কিন্তু বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় তাঁদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা ধরনের সন্দেহ ও গুঞ্জনের কথা বলছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, একটি দালালচক্র ও সুবিধাবাদী মহল গোপনে নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, নিয়োগকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের গুঞ্জনও রয়েছে। এ কারণে প্রকাশ্যে বিজ্ঞপ্তি দিতে বিলম্ব করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ বা সত্যতা এখনো পাওয়া যায়নি। পৌর কর্তৃপক্ষও এ ধরনের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগকে আপাতত স্থানীয়দের উত্থাপিত অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত বা যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য বেশ কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অন্তত একটি বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক, একটি স্থানীয় দৈনিক এবং সংশ্লিষ্ট পৌরসভার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। এর ফলে চাকরিপ্রার্থীরা উন্মুক্তভাবে নিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু লিখিত পরীক্ষা নয়, মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থাও রাখার নির্দেশনা রয়েছে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যবহারিক পরীক্ষাও নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট পদের ধরন অনুযায়ী প্রার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও ব্যবহারিক সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে। এ ধরনের পরীক্ষাভিত্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণের উদ্দেশ্য হলো যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা এবং নিয়োগে ব্যক্তিগত পছন্দ বা প্রভাবের সুযোগ কমানো।
এ ছাড়া দৈনিক হাজিরাভিত্তিক বা মাস্টাররোলের মাধ্যমে এসব পদে অস্থায়ী নিয়োগ না দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে। অর্থাৎ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা ও নির্ধারিত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পদগুলোতে অনানুষ্ঠানিকভাবে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। সরকার ঘোষিত সর্বশেষ নীতিমালা অনুসরণ করে নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করার পর মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবহিত করার কথাও বলা হয়েছে।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছে পৌর প্রশাসন। নবীনগর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, জনবল নিয়োগের অনাপত্তি ও ছাড়পত্রের চিঠি সম্প্রতি তাঁদের হাতে এসেছে। নিয়োগ কার্যক্রম স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার জন্য জেলা প্রশাসকের একজন প্রতিনিধি চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
ইউএনওর ভাষ্য অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি পাওয়ার পর স্থানীয় কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নিয়োগ কমিটি গঠন করা হবে। এরপর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। পরীক্ষা ও বাছাই প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
রাকিবুল ইসলাম আরও বলেছেন, তিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা নিয়োগ-বাণিজ্যের সুযোগ থাকবে না। পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে কোনো পদে মাস্টাররোলের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ারও সুযোগ নেই বলে তিনি স্পষ্ট করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পুরো নিয়োগ কার্যক্রম নির্ধারিত নিয়ম মেনেই পরিচালিত হবে।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তারিকুল ইসলামও জানিয়েছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিনিধি চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রতিনিধি পাওয়ার পর নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলেও জানিয়েছেন।
পৌরসভার এই বক্তব্যের ফলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে বিলম্বের একটি প্রশাসনিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের দাবি, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে নিয়োগ কমিটি গঠন এবং জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রয়োজন। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা হলো, প্রশাসনিক প্রস্তুতি দ্রুত শেষ করে আনুষ্ঠানিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে, যাতে আগ্রহী প্রার্থীরা সমান সুযোগ পান।
নবীনগর পৌরসভার এই পাঁচটি পদ স্থানীয় চাকরিপ্রার্থীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বা পৌর প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুযোগ সাধারণত স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন পর কোনো শূন্য পদে নিয়োগের অনুমোদন এলে শিক্ষিত তরুণ ও সংশ্লিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা আবেদন করার প্রস্তুতি নেন। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা এসব প্রার্থীর কাছে নিয়োগের সময়সূচি ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
নকশাকার, কর নির্ধারণ ও কর আদায়, লাইসেন্স পরিদর্শন এবং বিদ্যুৎ মিস্ত্রির মতো পদগুলো পৌরসভার দৈনন্দিন সেবা কার্যক্রমের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। এসব পদে প্রয়োজনীয় জনবল থাকলে পৌরসভার নাগরিক সেবা কার্যক্রম আরও নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে। কর নির্ধারণ ও আদায় থেকে শুরু করে লাইসেন্সসংক্রান্ত কাজ এবং অবকাঠামোগত বিভিন্ন কারিগরি দায়িত্ব পালনে দক্ষ জনবল প্রয়োজন হয়।
পৌরসভার শূন্য পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা শুধু চাকরিপ্রার্থীদের জন্য নয়, স্থানীয় নাগরিকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রমের সঙ্গে নাগরিক সেবা সরাসরি সম্পর্কিত। যোগ্য ও দক্ষ জনবল নিয়োগ হলে সেবা কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে প্রতিষ্ঠানটির ওপর জনআস্থার প্রশ্নও দেখা দিতে পারে।
এ কারণে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা, আবেদন করার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি নিয়োগের নামে অর্থ দাবি করে বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তাহলে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করাও প্রয়োজন।
বর্তমানে নবীনগর পৌরসভার পাঁচটি পদে নিয়োগের বিষয়টি মূলত প্রশাসনিক প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য থেকে জানা যাচ্ছে। জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি পাওয়ার পর নিয়োগ কমিটি গঠন এবং পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হওয়া প্রশ্নের বড় অংশের উত্তর মিলবে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও আনুষ্ঠানিক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর।
চাকরিপ্রার্থী ও স্থানীয় নাগরিকদের প্রত্যাশা, অনুমোদিত পদগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে যেসব অভিযোগ ও গুঞ্জন স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়েছে, সেগুলোর অবসান ঘটাতে স্বচ্ছ ও প্রকাশ্য নিয়োগ প্রক্রিয়াই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
নবীনগর পৌরসভা কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো নিয়োগ বা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই। এখন জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি মনোনয়ন, নিয়োগ কমিটি গঠন এবং বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরই বোঝা যাবে পাঁচটি পদে নিয়োগ কার্যক্রম কত দ্রুত এগোয়। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় চাকরিপ্রার্থীদের অপেক্ষার অবসান হওয়ার পাশাপাশি নিয়োগ নিয়ে তৈরি হওয়া বিভিন্ন প্রশ্নেরও বাস্তব উত্তর মিলবে।