ইতালির স্কুলে বোরকা-নিকাব নিষেধের উদ্যোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২১ বার
ইতালির স্কুলে বোরকা-নিকাব নিষেধের উদ্যোগ

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইতালির স্কুলব্যবস্থায় পোশাক ও ভাষাগত একীভূতকরণ নিয়ে নতুন নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, দেশটির স্কুলগুলোতে মুখ সম্পূর্ণভাবে ঢেকে রাখা বোরকা ও নিকাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। একই সঙ্গে যেসব শিক্ষার্থী ইতালীয় ভাষায় কথা বলতে পারে না, একটি শ্রেণিকক্ষে তাদের সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর ৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের ইতালীয় ভাষা শেখার সুযোগ বাড়ানো এবং বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের ইতালির শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে একীভূত করা। তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ, শিক্ষক সংগঠনের উদ্বেগ এবং অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকার স্কুলগুলোর বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মেলোনি সরকারের প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভা এ বিষয়ে অধ্যাদেশ অনুমোদন করে। রবিবার ব্রাদার্স অব ইতালির যুব শাখার এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী মেলোনি নতুন ব্যবস্থার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যেও ইতালীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি এবং স্কুলে বোরকা-নিকাব বন্ধের উদ্যোগের প্রতি সরকারের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

প্রস্তাবিত নিয়ম কার্যকর হলে স্কুলে মুখঢাকা পোশাক পরার বিষয়টি নতুন বিধিনিষেধের আওতায় আসবে। নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ হাজার ইউরো জরিমানার বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে এই বিধান বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষের জন্য কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকবে, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত বাস্তবায়ন কাঠামো প্রয়োজন হবে।

ভাষাগত সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত। আগামী বছর থেকে কোনো একটি শ্রেণিকক্ষে ইতালীয় ভাষায় কথা বলতে পারে না—এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর ৩০ শতাংশের বেশি রাখা যাবে না। সরকারের যুক্তি, একই শ্রেণিতে ইতালীয় ভাষা না জানা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এতে ভাষা শেখার গতি কমার পাশাপাশি নতুন পরিবেশে শিক্ষার্থীদের একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াও জটিল হতে পারে।

ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা জানিয়েছেন, কোনো স্কুলের পক্ষে ৩০ শতাংশের সীমা বাস্তব পরিস্থিতির কারণে মানা সম্ভব না হলে বিশেষ ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট স্কুলে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি ভাষাগত সহায়তার জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, নতুন ভাষাগত সীমার আওতায় পড়তে পারে প্রায় ১ হাজার শ্রেণিকক্ষ। দেশটির মোট শ্রেণিকক্ষের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ০.৩ শতাংশ। অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়ে সংখ্যাটি তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় এর প্রভাব বেশি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব শহর বা এলাকায় অভিবাসী পরিবারের সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকার স্কুলগুলোকে শিক্ষার্থীদের নতুনভাবে শ্রেণিবিন্যাস, ভাষা সহায়তা এবং শিক্ষক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হতে পারে।

প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ কার্যকর করতে ইতালির সংসদের অনুমোদনও প্রয়োজন হবে। নিয়ম অনুযায়ী, অধ্যাদেশ জারির পর ৬০ দিনের মধ্যে সংসদে এর অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাতারেল্লার স্বাক্ষরের প্রয়োজন রয়েছে। ফলে সরকারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরও পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কিছু সাংবিধানিক ও আইনগত ধাপ অতিক্রম করতে হবে।

ইতালির স্কুলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে দেশটির স্কুলগুলোর মোট শিক্ষার্থীর ১১.২ শতাংশ ছিল অন্য দেশের নাগরিক। তবে এই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেশজুড়ে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। একই শিক্ষাবর্ষে ইতালির মোট শ্রেণিকক্ষের ৭.৬ শতাংশে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ শতাংশের বেশি ছিল।

সরকারের নতুন নীতি মূলত এই শ্রেণিকক্ষগুলোতেই বেশি পরিবর্তন আনতে পারে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শ্রেণিতে পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি ভাষা শেখানোর জন্য অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন হবে। এতে স্কুল প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও পরিবর্তন আসতে পারে। সরকার বলছে, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হবে, যাতে নতুন নীতির কারণে স্কুলগুলো একা চাপের মুখে না পড়ে।

তবে সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি রয়েছে। বিরোধী রাজনীতিকদের একাংশের অভিযোগ, আগামী বছরের নির্বাচনকে সামনে রেখে মেলোনি সরকার অভিবাসন, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসছে। তাদের বক্তব্য, এর ফলে স্কুলশিক্ষার বাস্তব সমস্যা আড়ালে পড়ে যেতে পারে।

বিরোধীদের কেউ কেউ আরও দাবি করেছেন, উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উত্থান মোকাবিলায় সরকার অভিবাসন ও সংস্কৃতিসংক্রান্ত কঠোর অবস্থানকে সামনে আনছে। বিশেষ করে ন্যাশনাল ফিউচার দলের পক্ষ থেকে স্কুলে বোরকা নিষিদ্ধ করার দাবি আগেই তোলা হয়েছিল। ফলে নতুন সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে দেশটির বৃহত্তর অভিবাসন ও পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক বিতর্কের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা এলি শ্লেইনও সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, একটি নতুন আদর্শিক বিতর্ক তৈরি করে সরকারি স্কুলব্যবস্থার বিদ্যমান সমস্যাগুলো থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে এটি বিরোধী রাজনীতিকদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন; সরকার তাদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের উদ্যোগকে শিক্ষা ও সামাজিক একীভূতকরণের নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।

শিক্ষক ইউনিয়নগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, নতুন নিয়ম প্রণয়নের আগে শিক্ষকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করা হয়নি। শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করলেই ভাষাগত সমস্যা সমাধান হবে না; এর জন্য দক্ষ শিক্ষক, অতিরিক্ত ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম, পর্যাপ্ত অর্থ এবং বাস্তবসম্মত প্রশাসনিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

স্কুল প্রধানদেরও বিশেষ করে অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলো নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একটি শ্রেণিকক্ষে নির্দিষ্ট অনুপাতে শিক্ষার্থী রাখার নিয়ম কাগজে সহজ মনে হলেও বাস্তবে স্কুলের অবকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, শিক্ষার্থীর বয়স, ভাষাগত দক্ষতা এবং স্থানীয় জনসংখ্যার কাঠামোর সঙ্গে বিষয়টি জড়িত। ফলে কোনো এলাকায় পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষক না থাকলে নতুন নীতি বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।

জাতীয় প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি আন্তোনেল্লো জিয়ানেল্লি বলেছেন, শিক্ষার দিক থেকে উদ্যোগটির উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে কার্যকর বাস্তব সমাধানে পরিণত করা সহজ নয়। তার বক্তব্যে মূলত নীতির উদ্দেশ্যের পাশাপাশি বাস্তবায়নের সক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

সব মিলিয়ে ইতালির স্কুলে নতুন নিয়ম চালু হলে এর প্রভাব শুধু বোরকা ও নিকাব পরার বিধিনিষেধেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভাষাগতভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পুনর্বিন্যাস এবং স্কুল প্রশাসনের নতুন দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় একটি সমন্বিত পরিবর্তন আসতে পারে।

সরকারের দৃষ্টিতে এটি ইতালীয় ভাষা শেখা ও সামাজিক একীভূতকরণকে জোরদার করার পদক্ষেপ। অন্যদিকে বিরোধী দল, শিক্ষক ইউনিয়ন ও কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষ মনে করছে, বাস্তব সমস্যার সমাধানে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও সম্পদ নিশ্চিত না হলে নতুন নিয়ম অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ তৈরি করতে পারে। এখন অধ্যাদেশটি সংসদীয় অনুমোদন ও পরবর্তী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কীভাবে এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করবে ইতালির স্কুলগুলোতে এই নীতির প্রকৃত প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত