ইসরাইলি পুলিশে পদত্যাগ বাড়ায় জনবল সংকট

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২২ বার
ইসরাইলি পুলিশে পদত্যাগ বাড়ায় জনবল সংকট

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসরাইলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে জনবল সংকট নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশটির পুলিশের প্রায় ২৮ শতাংশ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন বলে একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ জনবল পরিস্থিতি নিয়ে বন্ধ দরজার বৈঠকে উপস্থাপিত এবং নথিভুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই চিত্র পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।

বেন-গভির ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পুলিশের সদস্যদের পদত্যাগের হার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। একই সময়ে পুলিশে নতুন সদস্য নিয়োগের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু নিয়োগ বৃদ্ধি সত্ত্বেও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কাঙ্ক্ষিত জনবল ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নতুন নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি বর্ডার পুলিশ অথবা জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ন্যাশনাল গার্ডে দায়িত্ব পেয়েছেন। এর ফলে পুলিশে সামগ্রিকভাবে সদস্য সংখ্যা বাড়লেও প্রচলিত পুলিশ স্টেশন ও ট্রাফিক বিভাগে প্রয়োজনীয় জনবল ঘাটতি রয়ে গেছে। বর্তমানে এসব ইউনিটে প্রায় ২ হাজার কর্মকর্তার ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।

ইসরাইলের মতো নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জপূর্ণ দেশে পুলিশের জনবল কাঠামো শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; সীমান্ত নিরাপত্তা, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো ইউনিটে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা না থাকলে দায়িত্বে থাকা সদস্যদের কাজের চাপ বাড়তে পারে এবং বাহিনীর সামগ্রিক কার্যক্রমেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

পুলিশে পদত্যাগের পাশাপাশি নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। নতুন সদস্যদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্ডার পুলিশ ও ন্যাশনাল গার্ডে যাওয়ায় প্রচলিত পুলিশিং কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত হারে জনবল যুক্ত হচ্ছে না। ফলে একদিকে নতুন সদস্য নিয়োগের সংখ্যা বাড়লেও অন্যদিকে পুলিশ স্টেশন ও ট্রাফিক বিভাগে ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে।

এই পরিস্থিতির সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যাশনাল গার্ড গঠনের বিষয়টিও যুক্ত হয়ে আছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে ইসরাইলি সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যাশনাল গার্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়। বাহিনীটির নিয়ন্ত্রণ বেন-গভিরের অধীনে রাখার সিদ্ধান্ত সে সময় রাজনৈতিকভাবে বিতর্ক তৈরি করেছিল।

বিরোধী রাজনীতিকরা তখন অভিযোগ করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে বেন-গভিরের নিয়ন্ত্রণে একটি পৃথক বাহিনী গঠনের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, নতুন বাহিনীর কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দেশের প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ন্যাশনাল গার্ডকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

ন্যাশনাল গার্ড গঠনের পর এর দায়িত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো এবং পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি নিয়ে ইসরাইলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এখন পুলিশের জনবল সংকটের তথ্য সামনে আসায় একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, নতুন নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের ফলে বিদ্যমান পুলিশ বাহিনীর জনবল ব্যবস্থাপনায় কোনো প্রভাব পড়েছে কি না।

তবে পুলিশের কর্মকর্তাদের পদত্যাগের কারণ হিসেবে শুধুমাত্র ন্যাশনাল গার্ড বা জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের কাঠামোকে দায়ী করা হয়েছে—এমন কোনো সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখানে নেই। পদত্যাগের পেছনে কর্মপরিবেশ, দায়িত্বের চাপ, সাংগঠনিক পরিবর্তন, বেতন-ভাতা, পেশাগত প্রত্যাশা কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক কারণও থাকতে পারে। প্রাপ্ত তথ্য মূলত পদত্যাগের হার এবং জনবল ঘাটতির চিত্র তুলে ধরছে।

ইসরাইলি পুলিশের অভ্যন্তরীণ জনবল সংকটের বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বিভিন্ন দিক থেকে চাপ রয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা অভিযানের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে একই বাহিনীকে একাধিক ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়।

বিশেষ করে ট্রাফিক বিভাগে জনবল ঘাটতির প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়তে পারে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনায় দ্রুত সাড়া দেওয়া, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার মতো কাজের জন্য পর্যাপ্ত কর্মকর্তা প্রয়োজন। পুলিশ স্টেশনগুলোতেও অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, টহল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার দায়িত্ব নিয়মিতভাবে পালন করতে হয়।

জনবল ঘাটতির আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাব হতে পারে কর্মরত কর্মকর্তাদের ওপর বাড়তি দায়িত্বের চাপ। পর্যাপ্ত সংখ্যক সদস্য না থাকলে একই কর্মকর্তাকে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের পরিস্থিতি বাহিনীর কর্মপরিবেশ এবং সদস্য ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এসব সম্ভাব্য প্রভাবের মাত্রা নির্ধারণ করতে আরও বিস্তারিত তথ্য ও গবেষণা প্রয়োজন।

পুলিশে নতুন নিয়োগ বাড়ানোর পরও কেন প্রায় ২ হাজার কর্মকর্তার ঘাটতি রয়ে গেছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এর একটি অংশ নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের দায়িত্ব বণ্টনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে বোঝা যায়। অন্যদিকে একই সময়ে পুলিশের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পদত্যাগ করলে নতুন নিয়োগ দিয়ে সেই শূন্যতা দ্রুত পূরণ করা কঠিন হতে পারে।

একজন নতুন পুলিশ সদস্যকে নিয়োগের পর প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন দায়িত্বে দক্ষতা অর্জনের জন্য সময় প্রয়োজন হয়। ফলে সংখ্যাগতভাবে নতুন নিয়োগ বাড়লেও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদত্যাগের কারণে তৈরি হওয়া ঘাটতি তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ নাও হতে পারে। বিশেষায়িত দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ইসরাইলের নিরাপত্তা কাঠামোতে পুলিশ, বর্ডার পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে একটি বাহিনীতে সদস্য সংখ্যা বাড়লেও তা অন্য ইউনিটের ঘাটতি সরাসরি পূরণ করতে পারে না। নতুন সদস্যদের কোথায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে এবং কোন ইউনিটে কতজন কর্মকর্তা প্রয়োজন—জনবল পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

ন্যাশনাল গার্ডকে জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখার সিদ্ধান্তও এই বৃহত্তর কাঠামোর অংশ। সরকার মনে করে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরিতে এই বাহিনী ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে বিরোধীদের একাংশ দীর্ঘদিন ধরে এর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে নতুন বাহিনীর সম্প্রসারণ এবং প্রচলিত পুলিশের জনবল পরিস্থিতি একই সময়ে আলোচনায় আসায় বিষয়টি রাজনৈতিক গুরুত্বও পেয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুলিশের প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর মধ্যে দায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রাখা। নতুন সদস্য নিয়োগের মাধ্যমে সংখ্যাগত ঘাটতি কমানোর চেষ্টা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

একই সঙ্গে জনবল সংকটের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করাও জরুরি। কতজন কর্মকর্তা কোন সময়ে পদত্যাগ করেছেন, তাদের পদত্যাগের কারণ কী, নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের কতজন প্রচলিত পুলিশে এবং কতজন অন্য নিরাপত্তা ইউনিটে যাচ্ছেন—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে। শুধু মোট পদত্যাগের সংখ্যা দিয়ে পুলিশের কার্যক্ষমতার ওপর সুনির্দিষ্ট প্রভাব নির্ধারণ করা যায় না।

তবে ২৮ শতাংশ কর্মকর্তার পদত্যাগ এবং প্রায় ২ হাজার কর্মকর্তার ঘাটতির তথ্য ইসরাইলি পুলিশে জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে। নতুন নিয়োগ বাড়ানোর পরও যদি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোতে ঘাটতি থেকে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর জনবল পরিকল্পনার প্রয়োজন হতে পারে।

এদিকে ন্যাশনাল গার্ডের ভূমিকা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত থাকলে পুলিশের সঙ্গে নতুন বাহিনীর দায়িত্বের সীমারেখা এবং সমন্বয় নিয়েও আলোচনা চলবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একাধিক বাহিনীর দায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে সমন্বয়, জবাবদিহি ও স্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে ইসরাইলি পুলিশের বর্তমান জনবল পরিস্থিতি দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জকে সামনে এনেছে। একদিকে কর্মকর্তাদের পদত্যাগের প্রবণতা, অন্যদিকে নতুন সদস্যদের বিভিন্ন নিরাপত্তা ইউনিটে নিয়োগ এবং প্রচলিত পুলিশ স্টেশন ও ট্রাফিক বিভাগে প্রায় ২ হাজার কর্মকর্তার ঘাটতি—এই তিনটি বিষয় একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে। আগামী সময়ে সরকার ও পুলিশ প্রশাসন কীভাবে এই ঘাটতি মোকাবিলা করে এবং বাহিনীর জনবল ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়ায়, সেটিই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত