দক্ষিণ আফ্রিকায় দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৭ বার
দক্ষিণ আফ্রিকায় দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় অনিবন্ধিত বিদেশি নাগরিকদের ইস্যু, ভয়াবহ অপরাধ এবং নারীদের হত্যা ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’ আন্দোলন। আগামী বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় এই কর্মসূচি পালনের কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। এবারের কর্মসূচিতে বিশেষভাবে পুরুষদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। আয়োজকদের ভাষ্য, নারীদের হত্যা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে পুরুষদের নীরব না থেকে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।

‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’ এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বরকে অনিবন্ধিত বিদেশি নাগরিকদের দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ার জন্য একটি সময়সীমা হিসেবে ঘোষণা করেছিল। তবে সংগঠনটির দেওয়া এই সময়সীমার কোনো সরকারি বা আইনগত ক্ষমতা নেই। কোনো বিদেশি নাগরিককে দেশ থেকে বহিষ্কার করা কিংবা অভিবাসন আইন প্রয়োগ করার এখতিয়ার কেবল রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের। দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশও জানিয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির বিষয়ে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং স্বাভাবিক পুলিশিং ব্যবস্থার মধ্যেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এবারের কর্মসূচিকে ঘিরে আন্দোলনটির অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে অনিবন্ধিত অভিবাসনবিরোধী অবস্থানই ছিল মূল বিষয়, সেখানে সাম্প্রতিক নারী হত্যা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং ভয়াবহ অপরাধের ঘটনাগুলোকে সামনে এনে কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হয়েছে। সংগঠনটির মুখপাত্র স্যান্ডিলে ডুবে জানিয়েছেন, অনিবন্ধিত অভিবাসনের বিরোধিতা তাদের আন্দোলনের মূল অবস্থান হলেও দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অপরাধ ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিষয়টিও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

আয়োজকদের ঘোষণায় ৩০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে পুরুষদের জন্য বিশেষ একটি ‘মেনস মার্চ’ হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, নারীদের হত্যা বা নির্যাতনের ঘটনায় পুরুষ সমাজ নীরব থাকতে পারে না। পুরুষদের সামনে থেকে মিছিলে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি সামাজিক বার্তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নারীদেরও কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

গৌতেং ও কোয়াজুলু-নাটাল প্রদেশে বড় কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে। গৌতেংয়ের প্রিটোরিয়ায় চার্চ স্কয়ার থেকে মিছিল শুরু হয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে ইউনিয়ন বিল্ডিংসে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে কোয়াজুলু-নাটালের ডারবানে আলবার্ট পার্ক এলাকা থেকে মিছিল শুরু করে প্রাদেশিক পুলিশ সদর দপ্তরের দিকে যাওয়ার কথা রয়েছে। আরও কয়েকটি প্রদেশেও কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যদিও সব এলাকার চূড়ান্ত কর্মসূচি এখনো নিশ্চিত হয়নি।

এই বিক্ষোভের পেছনে দক্ষিণ আফ্রিকার সাম্প্রতিক অপরাধ পরিস্থিতিও বড় একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। গৌতেংয়ের ওয়েডেলা এলাকায় একটি পানশালায় হামলায় ১৭ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হন। একই রাতে কেপটাউনের ল্যান্ডলে এলাকায় আরেকটি হামলায় ১০ জন নিহত হন। এর আগে ডারবানের কাছে একটি বাড়িতে হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হওয়ার ঘটনাও দেশজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এসব ঘটনার পর অপরাধ দমন এবং জননিরাপত্তা নিয়ে সরকারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাও আন্দোলনটির নতুন কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় নারী হত্যার একাধিক ঘটনা জনমনে ক্ষোভ তৈরি করেছে। আন্দোলনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অপরাধ ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে পুরুষদের সামাজিক দায়বদ্ধতা গ্রহণ করতে হবে। আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু নারীদের বিষয় নয়; পুরুষদেরও এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাও সাম্প্রতিক সহিংসতা ও নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে একাধিক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তিনি সরকারের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে অপরাধীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার জন্য আরও সম্পদ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে নারীদের প্রতি পুরুষদের আচরণ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।

তবে ৩০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে ঘিরে অনিবন্ধিত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় চলমান অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন বিদেশি নাগরিক ও অভিবাসী সম্প্রদায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটার পর পরিস্থিতি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছিল। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, অভিবাসন আইন প্রয়োগের দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং কোনো ধরনের সহিংসতা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’ অবশ্য তাদের ঘোষিত কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা লুটপাট, সম্পত্তি ধ্বংস কিংবা সহিংসতার পক্ষে নয়। আইন ভঙ্গকারী যে কেউ হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। একই সঙ্গে আন্দোলনটির নেতারা দাবি করেছেন, তাদের কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো দেশের মানুষের উদ্বেগ ও ক্ষোভকে প্রকাশ্যে তুলে ধরা।

তবে অনিবন্ধিত অভিবাসন নিয়ে আন্দোলনের অবস্থান এবং দেশটিতে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আশঙ্কা—দুটি বিষয়ই এখন একই সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা সতর্ক করেছেন, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সহিংসতা বা বৈষম্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধান দেশটির ভূখণ্ডে থাকা মানুষের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও সমতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে। তাই অভিবাসন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আইনি প্রক্রিয়া ও মানবাধিকারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তাই একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে দেশের নাগরিকদের মধ্যে অপরাধ, বেকারত্ব, জননিরাপত্তা এবং অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। অন্যদিকে বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকানোও সরকারের দায়িত্ব। ফলে ৩০ সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভে পুলিশের প্রস্তুতি, মিছিলের নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য সংঘাত প্রতিরোধের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পুলিশ ইতোমধ্যে জানিয়েছে, কর্মসূচির জন্য আলাদা কোনো বিশেষ বাজেট বরাদ্দ করা হয়নি; বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে।

সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একদিকে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হত্যার ঘটনায় পরিবারগুলো আতঙ্কিত, অন্যদিকে বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে নতুন করে হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষ। ফলে আগামী দিনের বিক্ষোভ শুধু একটি নির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দেশটির বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

৩০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন অভিবাসন, অপরাধ ও নারী নিরাপত্তা—তিনটি বিষয়ই জনআলোচনার কেন্দ্রে। বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলে সংগঠনটি তাদের দাবিগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরার একটি বড় সুযোগ পাবে। অন্যদিকে কোনো ধরনের সহিংসতা বা বিদেশি নাগরিকদের ওপর হামলা হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। তাই কর্মসূচির দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, আয়োজকদের দায়িত্বশীলতা এবং অংশগ্রহণকারীদের আচরণ পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, অভিবাসন নিয়ে অসন্তোষ, অপরাধের ভয় এবং নারীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন এখন পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তবে প্রতিটি সমস্যার সমাধান আলাদা নীতিগত ও আইনি পদক্ষেপ দাবি করে। ৩০ সেপ্টেম্বরের দেশব্যাপী কর্মসূচি সেই বৃহত্তর সংকট নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সমাজে চলমান বিতর্ককে আরও সামনে আনবে। এখন নজর থাকবে বিক্ষোভ কতটা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, সরকার কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেয় তার দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত