প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশেষ ধরনের ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ ১৯টি দেশ ও বাণিজ্যিক জোটের জন্য ১০০ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে এসব সুবিধার আওতায় না থাকা দেশগুলো থেকে নির্দিষ্ট বিশেষ ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ আমদানিতে নতুন করে উচ্চ শুল্ক আরোপের ব্যবস্থা কার্যকর করেছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ওষুধবাজার, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এবং ওষুধ রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন শুল্কব্যবস্থার কার্যকারিতা শুরু হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নীতিমালা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু বিশেষায়িত ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে সংশ্লিষ্ট দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান বা ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ও নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় থাকতে হবে। ফলে একই ধরনের ওষুধ বা উপকরণ রপ্তানি করলেও দেশভেদে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের শুল্ক কাঠামো ভিন্ন হতে পারে।
নতুন ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত ওষুধের বাজার। বিরল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ, বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ, সেল থেরাপি, জিন থেরাপি এবং অ্যান্টিবডি ড্রাগ কনজুগেটসের মতো জটিল চিকিৎসাপদ্ধতিতে ব্যবহৃত পণ্য এই বিশেষ সুবিধার আওতায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রাণীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট ওষুধ এবং এসব ওষুধ তৈরিতে প্রয়োজনীয় সংশ্লিষ্ট উপকরণও শুল্ক ছাড়ের আওতায় রয়েছে। সরকারি নীতিমালায় আরও কিছু বিশেষায়িত ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক শূন্য করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশি ওষুধ প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিশেষায়িত ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুল্ক ছাড় পাওয়ার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের সব ধরনের ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশ করবে। বরং ঘোষণাটি নির্দিষ্ট বিশেষায়িত ওষুধ এবং সংশ্লিষ্ট উপকরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোন পণ্য সুবিধার আওতায় পড়বে, তার ওপর নির্ভর করবে শুল্কমুক্ত সুবিধার বাস্তব প্রয়োগ।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের পেছনে দেশটির ওষুধ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর নীতিগত লক্ষ্যও রয়েছে। মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ থেকে আমদানি করা গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে পেটেন্টকৃত ফার্মাসিউটিক্যালস, বায়োলজিকস এবং সংশ্লিষ্ট উপাদানের ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নতুন শুল্ক কাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সব ধরনের ওষুধকে একইভাবে বিবেচনা করা হয়নি। সাধারণভাবে বিশেষায়িত ওষুধের ক্ষেত্রে ছাড়ের ব্যবস্থা থাকলেও অন্যান্য নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে জেনেরিক ওষুধ এবং সংশ্লিষ্ট উপকরণের ক্ষেত্রে এই পর্যায়ে আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ আমদানি নীতিতে পণ্যের ধরন, উৎপাদনের দেশ এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক কাঠামো—সবকিছুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ দেশটির ওষুধশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ওষুধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিশেষায়িত ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ রপ্তানির সুযোগ বাড়লে তা দেশের ওষুধশিল্পের জন্য নতুন বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পণ্যের মান, আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, উৎপাদন সক্ষমতা এবং সরবরাহব্যবস্থার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো, গুয়াতেমালা, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, জর্ডান, মালয়েশিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড ও লিশটেনস্টাইন, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং ভিয়েতনামকে সুবিধার আওতায় রাখা হয়েছে। তালিকাটিকে ১৯টি দেশ বা বাণিজ্যিক এখতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যেখানে সুইজারল্যান্ড ও লিশটেনস্টাইনকে যৌথভাবে ধরা হয়েছে।
এই দেশগুলোকে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান বা সম্ভাব্য বাণিজ্য ও নিরাপত্তা কাঠামোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি সাধারণ শুল্কছাড়ের সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর বাণিজ্যনীতি ও সরবরাহব্যবস্থার কৌশলও সম্পর্কিত। বিশেষ করে ওষুধের মতো স্বাস্থ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রোগীদের জন্যও এই নীতির প্রভাব পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষায়িত ওষুধের সরবরাহব্যবস্থায় অতিরিক্ত শুল্কের প্রভাব পড়লে আমদানিকারক, উৎপাদক এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ব্যয় বাড়তে পারে। আবার নির্দিষ্ট দেশ ও পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় বজায় থাকলে সরবরাহব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বিরল রোগ, বন্ধ্যত্ব বা জটিল জিন ও সেল থেরাপির মতো চিকিৎসায় ব্যবহৃত পণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহের ধারাবাহিকতা রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি তাই শুধু শুল্ক সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হলে উৎপাদকদের আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, গবেষণা ও উন্নয়ন বাড়ানো এবং উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত ওষুধ উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিয়মকানুন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতির ফলে যেসব দেশ শুল্ক ছাড়ের আওতায় নেই, তাদের জন্য মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ কঠিন হতে পারে। একই ধরনের বিশেষায়িত ওষুধ বা উপকরণ রপ্তানিতে যদি বাড়তি শুল্ক দিতে হয়, তাহলে পণ্যের চূড়ান্ত মূল্য, সরবরাহ পরিকল্পনা এবং বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় তার প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ওষুধবাজারে সরবরাহকারীদের মধ্যে নতুন করে বাজার পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও দায়িত্বের একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বিশেষায়িত ওষুধে শুল্ক ছাড় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। তবে এই সুবিধা বাস্তবে কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে কোন কোন বাংলাদেশি পণ্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে সুবিধার আওতায় পড়ছে এবং দেশীয় উৎপাদকরা যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বাজারমান ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্য রাখতে পারছেন তার ওপর। ফলে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণাকে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের জন্য সম্ভাবনাময় একটি সুযোগ হিসেবে দেখা গেলেও এর বাস্তব সুফল পেতে প্রয়োজন হবে পরিকল্পিত রপ্তানি কৌশল, মানসম্পন্ন উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রস্তুতি।