প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের দামের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। বাজার পরিস্থিতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দাবি করলে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত মজুদে থাকা তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান ফাতিহ বিরোল। বিশেষ করে ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের বাজার পরিস্থিতির দিকে ঘনিষ্ঠ নজর রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের জ্বালানিমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইইএ প্রধান এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন দেশের উদ্বেগের মধ্যে তাঁর এই মন্তব্য সামনে এলো। তবে কৌশলগত মজুদ থেকে ঠিক কত পরিমাণ তেল ছাড়া হতে পারে কিংবা কখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা দেননি তিনি।
ফাতিহ বিরোল বলেন, আইইএ সদস্য দেশগুলো বাজার পরিস্থিতি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের বাজারের দিকে নজর রাখা হচ্ছে। পরিস্থিতির প্রয়োজন হলে সদস্য দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, আপাতত কোনো নির্দিষ্ট পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়নি; বরং বাজারের গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে কৌশলগত মজুদ একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। বড় ধরনের সরবরাহ সংকট, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো কারণে বাজারে হঠাৎ জ্বালানি সরবরাহ কমে গেলে মজুদ তেল থেকে একটি অংশ বাজারে ছাড়ার মাধ্যমে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর উদ্দেশ্য শুধু তেলের সরবরাহ বাড়ানো নয়, বরং বাজারে আতঙ্ক ও অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিজেলের বাজার বিশেষভাবে নজরে রয়েছে। পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং পণ্য সরবরাহের সঙ্গে ডিজেলের সরাসরি সম্পর্ক থাকায় এর দাম ও সরবরাহে পরিবর্তনের প্রভাব দ্রুত অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে পৌঁছাতে পারে। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে পরিবহন খরচ বাড়ে, যার প্রভাব পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপরও পড়তে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
আইইএ প্রধানের বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত মজুদ ব্যবহারের বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে আলোচনা সামনে এসেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁসহ কয়েকজন নেতা তেলের দাম কমানোর লক্ষ্যে কৌশলগত মজুদ থেকে আরও তেল বাজারে ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যচাপ কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে বলে তাদের পক্ষ থেকে আলোচনা হয়েছে।
তবে এই প্রস্তাব নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ফাতিহ বিরোল সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে আইইএ এখনই কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং সংস্থাটির অবস্থান হলো, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন দেখা দিলে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা।
কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত সাধারণত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ। কারণ মজুদ তেল জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। বাজারে অস্থায়ী মূল্যচাপ কমাতে এই মজুদ ব্যবহার করা হলে তা কতটা কার্যকর হবে, কত দিন বাজারে প্রভাব বজায় থাকবে এবং ভবিষ্যতে বড় সংকট দেখা দিলে পর্যাপ্ত মজুদ থাকবে কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়। এ কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের গুরুত্ব থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তনের প্রভাবও ব্যাপক হতে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে বেশি অর্থ ব্যয় করে জ্বালানি কিনতে হলে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে। একই সঙ্গে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ডিজেলের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষি যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। কোনো দেশে ডিজেলের দাম বা সরবরাহে বড় পরিবর্তন এলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর পড়তে পারে। বিশেষ করে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে গেলে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এই বাস্তবতায় আইইএর বাজার পর্যবেক্ষণ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা বহন করছে। সংস্থাটি আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এর অর্থ হলো, বাজারে নতুন কোনো বড় ধরনের সরবরাহ সংকট বা মূল্যচাপ তৈরি হলে কৌশলগত মজুদ ব্যবহারের বিষয়টি আবারও সামনে আসতে পারে।
তবে মজুদ তেল বাজারে ছাড়লেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘমেয়াদে কমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বাজারে তেলের দামের ওপর উৎপাদন, সরবরাহ, পরিবহন, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক চাহিদাসহ একাধিক বিষয় প্রভাব ফেলে। কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়া হলে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ পরিস্থিতিতে প্রভাব পড়তে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বাজার স্থিতিশীলতার জন্য অন্যান্য বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে।
বর্তমানে আইইএর পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ফাতিহ বিরোলের বক্তব্যে বরং প্রয়োজন হলে সদস্য দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও ডিজেলের দামের গতিপ্রকৃতি, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন দেশের নীতিগত সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের জীবনেও সরাসরি প্রভাব ফেলে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের মূল্য পর্যন্ত বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে। আবার বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে সেই চাপ কিছুটা কমে আসতে পারে। তাই আইইএর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বাজার পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্ভাব্য জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়ার বিষয়ে আইইএ এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে সংস্থাটির প্রধানের বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, বাজার পরিস্থিতির অবনতি হলে এ বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ খোলা রাখা হয়েছে। আগামী দিনে তেল ও ডিজেলের বাজার কোন দিকে যায় এবং সরবরাহ পরিস্থিতিতে কতটা চাপ তৈরি হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে কৌশলগত মজুদ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কতটা সামনে আসে।