আমদানি করা ১৩৫ টন চালে আফলাটক্সিন, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
আমদানি করা ১৩৫ টন চালে আফলাটক্সিন, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারত থেকে সরকারিভাবে আমদানি করা চালের প্রাথমিক পরীক্ষায় খাবার উপযোগী বলে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও পরবর্তী পরীক্ষায় চট্টগ্রামের হালিশহর কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে সংরক্ষিত ১৩৫ টন চালে বিষাক্ত উপাদান আফলাটক্সিনের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এ ঘটনায় আমদানি করা খাদ্যশস্যের মান যাচাই, পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা এবং সরকারি গুদামে চাল সংরক্ষণের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অধিকতর পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি করা চালের মান নিয়ে আগে থেকেই আপত্তি ওঠার পরও কীভাবে প্রাথমিক পরীক্ষায় তা খাবার উপযোগী হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

হালিশহর কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামের ব্যবস্থাপক ইকবাল মাহমুদ জানিয়েছেন, গুদামে সংরক্ষিত ১৩৫ টন চালে আফলাটক্সিনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর অধিকতর পরীক্ষার জন্য নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে চালের নিরাপত্তা সম্পর্কে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। খাদ্যশস্যে ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত হওয়ার ঘটনা শুধু পণ্যের মানের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য, সরকারি খাদ্য মজুতের ব্যবস্থাপনা এবং আমদানি প্রক্রিয়ার জবাবদিহিও জড়িত।

আফলাটক্সিন এক ধরনের বিষাক্ত মাইকোটক্সিন, যা সাধারণত অ্যাসপারজিলাস গোত্রের কিছু ছত্রাকের মাধ্যমে তৈরি হয়। আর্দ্রতা ও তাপমাত্রাসহ পরিবেশগত কিছু শর্ত অনুকূলে থাকলে বিভিন্ন খাদ্যশস্যে এসব ছত্রাক জন্মাতে পারে। চাল, ভুট্টা, বাদামসহ নানা ধরনের কৃষিপণ্যে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে দূষিত খাদ্য দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে মানুষের শরীরে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই খাদ্যশস্য আমদানির সময় পরীক্ষা করার পাশাপাশি পরিবহন, গুদামজাতকরণ ও বিতরণের প্রতিটি পর্যায়ে মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এমভি এইচটি পাইওনিয়ার নামের একটি জাহাজে করে ভারত থেকে চালগুলো বাংলাদেশে আনা হয়। গত ২১ জুলাই জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়। পরদিন খাদ্য অধিদপ্তরের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে চালের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেই সময়ের পরীক্ষার প্রতিবেদনে চালকে খাবার উপযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২৪ ও ২৫ জুলাই চাল খালাস করা হয়।

পরবর্তী সময়ে আমদানি করা চালের একটি অংশ দেশের বিভিন্ন সরকারি খাদ্যগুদামে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ঢাকার তেজগাঁও কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম, চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম এবং গাজীপুরের জয়দেবপুর স্থানীয় খাদ্যগুদাম রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট গুদামে পৌঁছানোর পর চালের মান নিয়ে আপত্তি তোলেন কর্মকর্তাদের একাংশ। তাঁদের পর্যবেক্ষণে চালের নিম্নমানের বিষয়টি উঠে আসে এবং চালগুলো খাবারের উপযোগী কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।

চালের মান নিয়ে আপত্তি ওঠার পর পরিবহন ঠিকাদাররাও সেগুলো পরিবহনের কাজ স্থগিত রাখেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি খাদ্য সচিব ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে লিখিতভাবে জানানো হয়। এরপর চালের গুণগত মান নতুন করে যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যায়, প্রাথমিক পরীক্ষার পরও গুদামপর্যায়ে চালের মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। ফলে প্রথম পরীক্ষার পদ্ধতি, নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী পরীক্ষার ফলাফলের পার্থক্য বিশ্লেষণ করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

গত ১৭ আগস্ট গাজীপুরের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরীফা সুলতানা দীপ্তির নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি দল চট্টগ্রামে যায়। দলটি হালিশহর ও দেওয়ানহাট কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামের কয়েকটি চালের স্তূপ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। পরবর্তী পরীক্ষায় হালিশহর সিএসডিতে থাকা ১৩৫ টন চালে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি ধরা পড়ে। তবে এই ফলাফল দিয়ে অন্য সব গুদামে থাকা চাল দূষিত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি চালের চালান ও গুদামের নমুনা পরীক্ষা করে পৃথকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

খাদ্য বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জসিম উদ্দিন খানের নির্দেশে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার টন চালের বিতরণ স্থগিত রেখে মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরীক্ষায় ১৩৫ টন চালে ক্ষতিকর উপাদানটির উপস্থিতি পাওয়া যায়। বাকি চাল নিয়ম অনুযায়ী বিতরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক ইকবাল মাহমুদ এবং দেওয়ানহাট সিএসডির ব্যবস্থাপক হামিম রহমান। তবে বিতরণ করা চালের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পরীক্ষার পরিধি, নমুনার প্রতিনিধিত্ব এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো চালের একটি অংশে দূষণ শনাক্ত হলে ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট চালান ও সংরক্ষণ পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রয়োজন হতে পারে।

চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের চলাচল ও সংরক্ষণ শাখার নিয়ন্ত্রক রেজোয়ান সাকিব জানিয়েছেন, হালিশহর সিএসডির চালে আফলাটক্সিন শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি তিনি জেনেছেন। এ বিষয়ে অধিকতর পরীক্ষার জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল, দূষণের সম্ভাব্য উৎস এবং চালের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে খাদ্যশস্য বিতরণের আগে মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেসব সংস্থার, তাদের মধ্যে সমন্বয় ও তথ্যের স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।

ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আলী বলেছেন, আফলাটক্সিনযুক্ত খাবার দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে মানুষের যকৃৎ বা লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এ কারণে খাদ্যে আফলাটক্সিনের উপস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে কোনো নির্দিষ্ট চালের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দূষণের মাত্রা, খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ এবং কত দিন ধরে তা গ্রহণ করা হয়েছে—এসব বিষয় বিবেচনা করতে হয়। পরীক্ষার ফলাফলে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়া মানেই প্রত্যেক ভোক্তা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না।

এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, প্রাথমিক পরীক্ষায় চাল খাবার উপযোগী বলে বিবেচিত হওয়ার পরও পরবর্তী পরীক্ষায় ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত হলো কেন। নমুনা সংগ্রহের সময় চালের সব স্তূপ থেকে যথাযথভাবে নমুনা নেওয়া হয়েছিল কি না, পরীক্ষাগারের পদ্ধতি যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য ছিল কি না এবং পরিবহন বা সংরক্ষণের সময় নতুন করে ছত্রাকের বিস্তার ঘটেছে কি না—এসব সম্ভাবনা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চাল আমদানির সময়কার আর্দ্রতা, জাহাজে পরিবহনের পরিবেশ এবং গুদামের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে। তবে এসবের কোনো একটি কারণকে পরীক্ষার আগে নিশ্চিতভাবে দায়ী করা যায় না।

সরকারি খাদ্য মজুতের ক্ষেত্রে গুণগত মান নিশ্চিত করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি করা চাল সাধারণত খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিভিন্ন গুদামে সংরক্ষণ করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিতরণ করা হয়। তাই কোনো চালের মান নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে দ্রুত নমুনা পরীক্ষা, বিতরণ নিয়ন্ত্রণ, সংশ্লিষ্ট চালান শনাক্তকরণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রয়োজন। পরীক্ষায় অনিরাপদ প্রমাণিত খাদ্য যেন মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি অপরিহার্য।

হালিশহর সিএসডির ১৩৫ টন চালে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার ঘটনা খাদ্য আমদানি ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এখন অধিকতর পরীক্ষার ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুসন্ধান থেকে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন, দূষণের মাত্রা কতটা, এর সম্ভাব্য উৎস কোথায় এবং একই চালানের অন্য অংশে কোনো ঝুঁকি রয়েছে কি না। পাশাপাশি প্রাথমিক পরীক্ষার সঙ্গে পরবর্তী পরীক্ষার ফলাফলের পার্থক্যের কারণ নির্ধারণ করাও জরুরি।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জনআস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। আমদানি করা চালের মান নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরিস্থিতির স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দিতে হবে। বিশেষ করে খাদ্যশস্যের মান যাচাইয়ে কোনো ধরনের ঘাটতি থাকলে তা চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অধিকতর পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই এখন নির্ধারণ করবে, এই চালের নিরাপত্তা নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com