জর্ডানে গির্জায় হামলায় নিহত ৭, আহত ৩৪

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১২ বার
জর্ডানে গির্জায় হামলায় নিহত ৭, আহত ৩৪

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডানে একটি গ্রিক অর্থোডক্স গির্জায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলার সময় ভয়াবহ হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩৪ জন। শুক্রবার কারাক প্রশাসনিক অঞ্চলের হামুদ এলাকার একটি গ্রামে এ হামলার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই হঠাৎ বিকট শব্দ শোনা যায়। এরপর সন্দেহভাজন বন্দুকধারীরা গির্জার ভেতরে প্রবেশ করে কয়েক মিনিট ধরে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। শোকের একটি ধর্মীয় আয়োজন মুহূর্তেই পরিণত হয় আতঙ্ক, প্রাণহানি ও স্বজন হারানোর ঘটনায়।

জর্ডানের জননিরাপত্তা অধিদপ্তরের পরিচালক ওবাইদুল্লাহ আল-মায়েতাহ এক সংবাদ সম্মেলনে সাতজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, হামলায় আহতদের মধ্যে অন্তত ২৭ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আহতের মোট সংখ্যা ৩৪ বলে জানানো হলেও তাঁদের সবার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিচয়, তাঁদের বয়স কিংবা তাঁরা সবাই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে এসেছিলেন কি না, সে বিষয়েও তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি।

ঘটনার পরপরই নিরাপত্তা বাহিনী গির্জা ও আশপাশের এলাকায় তৎপরতা বাড়ায়। হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন জননিরাপত্তা অধিদপ্তরের পরিচালক। তিনি বলেন, হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং দেশের জাতীয় ঐক্যে আঘাত হানার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। তবে হামলার পেছনে কারা রয়েছে, কী উদ্দেশ্যে এই সহিংসতা চালানো হয়েছে কিংবা এর সঙ্গে কোনো সংগঠনের যোগসূত্র আছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের বর্ণনায় ঘটনার ভয়াবহতা উঠে এসেছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, গির্জায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শোভাযাত্রা সবে শুরু হয়েছিল। উপস্থিত ব্যক্তিরা যখন শোকানুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ একটি বিকট শব্দ শোনা যায়। এরপর সন্দেহভাজন বন্দুকধারীরা গির্জায় ঢুকে পড়ে এবং কয়েক মিনিট ধরে গুলি চালায়। উপস্থিত মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন, আবার কেউ আহত ব্যক্তিদের সাহায্য করার চেষ্টা করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা গেছে। তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়া খালেদ বুরকান জর্ডানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল আল-মামালকাকে জানান, অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ করেই হামলা শুরু হয়। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সন্দেহভাজন হামলাকারীদের একজনের হাতে পিস্তল এবং অন্যজনের হাতে রাইফেল ছিল। এই তথ্য হামলায় একাধিক অস্ত্রধারীর সম্ভাব্য উপস্থিতির ইঙ্গিত দিলেও হামলাকারীর প্রকৃত সংখ্যা এবং তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পর গির্জাটিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জর্ডানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন। হামলার স্থান ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সম্ভাব্য আলামত সংগ্রহ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। হামলাকারীরা কীভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন, হামলার পর কোন পথে পালানোর চেষ্টা করেছেন এবং তাঁদের কাছে থাকা অস্ত্রের উৎস কী—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হামলার আগে কোনো হুমকি বা সতর্কবার্তা পাওয়া গিয়েছিল কি না, তা জানা গেলে ঘটনার পটভূমি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

জর্ডানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাজেন আল-ফারায়া ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এটি নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলা এবং এর সঙ্গে জড়িত গোষ্ঠীর আচরণের কোনো মানবিক ব্যাখ্যা নেই। কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের নাম উল্লেখ না করে তিনি দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার অঙ্গীকার করেন। তিনি আরও বলেন, জর্ডানকে সন্ত্রাস ও সহিংসতার পথে টেনে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সংগঠন হামলার দায় স্বীকার করেনি। তাই হামলাকারীদের পরিচয় ও সম্ভাব্য উদ্দেশ্য নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।

দেশটির বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দেওয়া এই প্রতিক্রিয়ায় দেশের নিরাপত্তা ও জাতীয় ঐক্য রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। জর্ডান মধ্যপ্রাচ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ, যেখানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সীমান্তসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয় নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমন পরিস্থিতিতে ধর্মীয় স্থানে প্রাণঘাতী হামলা দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

গির্জায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় হামলার ঘটনাটি বিশেষভাবে মর্মান্তিক, কারণ সেখানে মানুষ সমবেত হয়েছিলেন একজন মৃত ব্যক্তিকে শেষ বিদায় জানাতে। শোকের মুহূর্তে উপস্থিত পরিবার, বন্ধু ও স্বজনদের জন্য এমন সহিংসতা একসঙ্গে একাধিক ধরনের মানসিক আঘাত তৈরি করতে পারে। কেউ হারিয়েছেন প্রিয়জনকে, কেউ আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, আবার কেউ চোখের সামনে ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতী ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরেছেন। নিহতদের পরিবারের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে শোক ও অনিশ্চয়তার কঠিন সময়। আহতদের চিকিৎসা এবং তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোও এখন জরুরি।

জর্ডানের কারাক অঞ্চলে অতীতেও বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৬ সালে কারাকের একটি প্রাচীন দুর্গ এলাকায় হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং কানাডার এক পর্যটকসহ অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছিলেন। সে সময় নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা অভিযানে হামলাকারীরা নিহত হন। অতীতের ওই ঘটনা বর্তমান হামলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অঞ্চলটিতে অতীতে ঘটে যাওয়া সহিংসতার স্মৃতি নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

এবারের হামলার সঙ্গে ২০১৬ সালের ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, কিংবা বর্তমান ঘটনায় কোনো চরমপন্থী সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। অতীতের ঘটনার ভিত্তিতে বর্তমান হামলার জন্য কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দায়ী করা যথাযথ হবে না। তদন্তকারীদের জন্য প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ঘটনাস্থলের আলামত, অস্ত্রের ধরন এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সম্ভাব্য যোগাযোগ যাচাই করে একটি নির্ভরযোগ্য চিত্র তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে ভুল তথ্য বা যাচাই না করা দাবি ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোও গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মীয় স্থানে সহিংসতা কেবল প্রাণহানির কারণ হয় না; এটি মানুষের নিরাপত্তাবোধ, পারস্পরিক আস্থা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মতো শোকানুষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে আসে। এ ধরনের ঘটনার পর প্রতিশোধমূলক মনোভাব বা কোনো সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে দায়ী করার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। তাই অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাও জরুরি।

জর্ডানের হামুদ এলাকার গির্জায় সাতজনের প্রাণহানির ঘটনায় এখন তদন্ত ও নিরাপত্তা অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আহত ৩৪ জনের চিকিৎসা, হামলাকারীদের শনাক্তকরণ এবং ঘটনার উদ্দেশ্য উদ্‌ঘাটন—এই তিনটি বিষয়ই তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কর্তৃপক্ষ হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিয়েছে, আর দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তবে প্রকৃত দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট হবে তদন্তের অগ্রগতি ও পরবর্তী সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে। আপাতত নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং দেশটির মানুষের নিরাপত্তা ও ঐক্য বজায় রাখাই সবচেয়ে জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com