৪৭ বছর বয়সে এইচএসসি পাস, এবার আইন পড়তে চান আমিনুল

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
৪৭ বছর বয়সে এইচএসসি পাস, এবার আইন পড়তে চান আমিনুল
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনে দায়িত্ব ও ব্যস্ততা বাড়ে। সংসার, পেশা, সামাজিক দায়িত্ব কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে অনেকেরই পড়াশোনার পথ মাঝপথে থেমে যায়। তবে মনের মধ্যে শেখার ইচ্ছা বেঁচে থাকলে সেই পথ আবারও শুরু করা সম্ভব—এমনই এক অনুপ্রেরণার উদাহরণ তৈরি করেছেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. আমিনুল ইসলাম। ৪৭ বছর বয়সে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। শুধু পরীক্ষায় পাস করেই থেমে থাকতে চান না; এবার আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন দেখছেন এই জনপ্রতিনিধি।

আমিনুল ইসলামের শিক্ষাজীবনের শুরুটা হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। ১৯৯৯ সালে তিনি মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু এরপর নানা পারিবারিক ও জীবনের বাস্তবতায় নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সময়ের সঙ্গে সংসারের দায়িত্ব বেড়েছে, জীবিকার প্রয়োজনে ব্যস্ততা তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন তিনি। একসময় পড়াশোনার আনুষ্ঠানিক অধ্যায় থেমে গেলেও উচ্চমাধ্যমিক পাস করার ইচ্ছাটি তাঁর মনে রয়ে যায়।

দীর্ঘ ২৭ বছর পর সেই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন আমিনুল। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪ দশমিক ৪৬ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। গাজীপুর মহানগরের পুবাইল কারিগরি কলেজের ড্রেস মেকিং ট্রেড থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন এই জনপ্রতিনিধি। ফল প্রকাশের পর নিজের সাফল্যের খবর পেয়ে আনন্দে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, প্রস্তুতি এবং নতুন করে পড়াশোনায় ফেরার পর এই ফল তাঁর কাছে বিশেষ অর্জন হয়ে উঠেছে।

আমিনুল ইসলামের বাড়ি শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের চকপাড়া গ্রামের মেডিক্যাল মোড় এলাকায়। তাঁর বাবা তোরাব আলী। তিনি মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। টানা তিন মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় মানুষের নানা সমস্যা ও প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, সামাজিক দায়িত্ব পালন এবং পারিবারিক ব্যস্ততার মধ্যেই পড়াশোনার জন্য সময় বের করা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। তারপরও দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

নিজের ফল জানার মুহূর্তটির কথা বলতে গিয়ে আমিনুল ইসলাম জানান, দুপুরে তাঁর স্ত্রী ফোন করে পরীক্ষায় পাস করার খবর দেন। খবরটি শুনে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন। ২৭ বছর পর আবার পড়াশোনা শুরু করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াকে নিজের জীবনের বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, অনেক দিন ধরেই এইচএসসি পাস করার ইচ্ছা ছিল। অবশেষে সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। এখন আরও পড়াশোনা করতে চান তিনি এবং ভবিষ্যতে আইন বিষয়ে পড়ার পরিকল্পনা করছেন।

আমিনুলের এই সাফল্যকে ঘিরে তাঁর পরিবারেও তৈরি হয়েছে বিশেষ আনন্দের পরিবেশ। কারণ, চলতি বছর শুধু আমিনুলই নন, তাঁর স্ত্রী মোসা. হুসনে আরা এবং বড় ছেলে মো. স্বাধীনও এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। একই বছরে পরিবারের তিন সদস্যের পরীক্ষায় পাস করার ঘটনা তাঁদের ঘরে বাড়তি আনন্দ এনে দিয়েছে। পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে শিক্ষাগত সাফল্য অর্জন স্থানীয় মানুষের কাছেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

পরিবারের এই অর্জনের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ধরনের তাৎপর্য। সাধারণত সন্তানদের পড়াশোনায় উৎসাহ দিতে অভিভাবকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমিনুলের পরিবারে দেখা গেছে, পরিবারের সদস্যরাই একে অন্যের শিক্ষাযাত্রার অংশ হয়ে উঠেছেন। স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গে একই বছরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দকে পারিবারিক উৎসবে পরিণত করেছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে বয়স বা পারিবারিক অবস্থান কোনো চূড়ান্ত সীমা নয়।

আমিনুলের সহকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারাও তাঁর সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শামীম মৃধা বলেন, আমিনুলের পাসের খবর শুনে তাঁরা সবাই খুশি হয়েছেন। তাঁর মতে, বয়স যে পড়াশোনার পথে বাধা নয়, আমিনুল তা নিজের কাজের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। চেষ্টা ও অধ্যবসায় থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায়েই নতুন করে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব—এ অর্জন সেই বার্তাই দেয়।

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদ ভূঞাও আমিনুলের সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ৪৭ বছর বয়সে ধৈর্য ধরে পড়াশোনা করে এইচএসসি পাস করা আনন্দের খবর। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নানা ব্যস্ততার মধ্যেও পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া প্রশংসনীয়। তাঁর এই অর্জন পড়াশোনা থেকে দূরে থাকা বয়স্ক অনেক মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আমিনুলের সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ বিরতির পর আবার শিক্ষাজীবনে ফেরার মানসিক প্রস্তুতি। অনেকের কাছে ২৭ বছর পর পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন মনে হতে পারে। দীর্ঘ সময় বই থেকে দূরে থাকার কারণে পড়ার অভ্যাসে পরিবর্তন আসে, নতুন পাঠ্যসূচির সঙ্গে পরিচিত হতে হয়, পরীক্ষার নিয়মকানুনও নতুন করে বুঝে নিতে হয়। এর পাশাপাশি সংসার ও সামাজিক দায়িত্ব সামলে পড়াশোনার সময় বের করাও বড় চ্যালেঞ্জ। আমিনুলের ক্ষেত্রে এসব বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও তিনি লক্ষ্য থেকে সরে যাননি।

তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং সমাজে শিক্ষা নিয়ে প্রচলিত কিছু ধারণাকেও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। অনেকেই নির্দিষ্ট বয়সের পর পড়াশোনা শুরু করা বা পরীক্ষায় অংশ নেওয়াকে অস্বাভাবিক মনে করেন। কেউ কেউ পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা কর্মব্যস্ততার কারণে শিক্ষাজীবনে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করেও পিছিয়ে যান। আমিনুলের অভিজ্ঞতা দেখায়, দীর্ঘ বিরতির পরও পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে শিক্ষার পথে ফেরা সম্ভব।

বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর ব্যস্ততা ছিল স্বাভাবিকভাবেই বেশি। মানুষের নানা সমস্যা নিয়ে কাজ করা, ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব পালন এবং পরিবারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া সহজ ছিল না। তবু নিজের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি আবার শিক্ষাজীবনে ফিরেছেন। তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার মাধ্যমে নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা আরও বাড়ানোর সুযোগ পাবেন তিনি।

আমিনুলের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি শিক্ষাকে জীবনের একটি নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। এসএসসি পাসের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও উচ্চমাধ্যমিকের স্বপ্ন ত্যাগ করেননি। অবশেষে ৪৭ বছর বয়সে সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন। তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও এলাকার মানুষের অভিনন্দন এই অর্জনকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে।

জীবনের নানা পর্যায়ে দায়িত্ব ও প্রতিকূলতার কারণে অনেক মানুষের পড়াশোনা থেমে যায়। কিন্তু সেই বিরতি যে শিক্ষার সমাপ্তি নয়, আমিনুল ইসলাম তা নিজের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন। তাঁর এই সাফল্য এমন মানুষদের নতুন করে সাহস জোগাতে পারে, যাঁরা বয়স বা পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় রয়েছেন। ৪৭ বছর বয়সে এইচএসসি পাসের পর এবার আইন পড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে চান তিনি—আর সেই স্বপ্নের পথচলাই হয়ে উঠেছে তাঁর নতুন অর্জনের গল্প।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com