সীতাকুণ্ডে শিক্ষার্থীদের অবরোধ প্রত্যাহার, ডিসির আশ্বাস

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
সীতাকুণ্ডে শিক্ষার্থীদের অবরোধ প্রত্যাহার, ডিসির আশ্বাস
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের সড়ক ও রেলপথ অবরোধ ছয় ঘণ্টা পর প্রত্যাহার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সরাসরি হস্তক্ষেপ, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের আশ্বাস এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের পর মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে আন্দোলনকারীরা অবরোধ তুলে নেন। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথে সৃষ্ট অচলাবস্থা কাটিয়ে স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হয়।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা ও পরবর্তী পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন ডালাস পেট্রোল পাম্পের বিপরীতে একটি লরির ধাক্কায় একটি লোকাল বাস উল্টে গেলে কয়েকজন শিক্ষার্থী বাসটির নিচে চাপা পড়েন। এতে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাত গুরুতর আহত হন। তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। একই দুর্ঘটনায় আরও দুই শিক্ষার্থী আহত হন।

একজন তরুণ শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সহপাঠীকে হারানোর বেদনার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক পারাপার এবং মহাসড়কে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচল নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভও প্রকাশ পায়। তাঁদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ মহাসড়ক পারাপার করেন। অথচ সেখানে নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার জন্য কোনো স্থায়ী ফুটওভারব্রিজ নেই। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে শিক্ষার্থী ও পথচারীদের।

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করেন। একপর্যায়ে তাঁদের আন্দোলন রেলপথেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহনের পাশাপাশি বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে চলাচলকারী মানুষও আটকা পড়েন। এমনকি অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি যানবাহনের চলাচলও বিঘ্নিত হয়। রেলপথ অবরোধের কারণে ট্রেন চলাচলেও ব্যাঘাত ঘটে। ফলে সড়ক ও রেল—দুই যোগাযোগব্যবস্থায় একযোগে অচলাবস্থা তৈরি হয়।

পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার আগেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর তিনি আহত শিক্ষার্থীর চিকিৎসার বিষয়ে খোঁজ নিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন। একই সঙ্গে নিহত মাইশা মুশফিরাতের বাবা দিদারুল আলমের সঙ্গে কথা বলে গভীর সমবেদনা জানান এবং শোকাহত পরিবারের প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।

শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবিগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা করেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, মহাসড়কে অবৈধ পার্কিং বন্ধ এবং সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আশ্বাস দেন তিনি।

প্রথম দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম ও পুলিশ কর্মকর্তারা। পরে সেখানে উপস্থিত হন জেলা প্রশাসক। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বিপিএম, আনসার ও ভিডিপির জেলা কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষক এবং প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা। তাঁরা শিক্ষার্থীদের বক্তব্য শোনেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য আলোচনা করেন।

শিক্ষার্থীদের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে জেলা প্রশাসক মাইশার জানাজায়ও অংশ নেন। মহাসড়কে অনুষ্ঠিত জানাজায় সহপাঠীকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। শোকাবহ পরিবেশে জানাজা শেষে জেলা প্রশাসক আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের দাবিগুলো শোনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে একটি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ। তাঁদের বক্তব্য, প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থীকে ক্লাসে যাওয়া-আসা, আবাসন, পরিবহন এবং অন্যান্য প্রয়োজনে মহাসড়ক পার হতে হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরাও ওই এলাকা ব্যবহার করেন। কিন্তু নিরাপদ পারাপারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুতগতির যানবাহনের মধ্যে দিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক জানান, ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের জন্য তিনি সেদিনই লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানাবেন, যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজের উদ্যোগ নেওয়া যায়। পাশাপাশি মহাসড়কের দুই পাশে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন তিনি। শিক্ষার্থীদের কাছে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবি, কারণ তাঁরা মনে করেন, স্থায়ী অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

মহাসড়কে অবৈধ পার্কিং বন্ধের বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট পক্ষ রাস্তা দখল করে লরি কিংবা অন্য যানবাহন রাখতে পারবে না। মহাসড়কের ওপর অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিংয়ের সুযোগ দেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, বিভিন্ন স্থানে ভারী যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখার কারণে সড়কের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রশাসনের এই আশ্বাসকে তাঁরা তাঁদের নিরাপত্তার দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন।

দুর্ঘটনায় জড়িত লরিটি পুলিশ ইতিমধ্যে জব্দ করেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। তবে ঘটনার পর চালক পালিয়ে গেছেন। তাঁকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেন তিনি। চালককে দ্রুত আইনের আওতায় আনার বিষয়টি জেলা প্রশাসকও পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।

শিক্ষার্থীরা মোট আট দফা দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মামলা দায়ের, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লরিচালককে গ্রেপ্তার, চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা এবং নিহতের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয় রয়েছে। এ ছাড়া মহাসড়কের দুই পাশে গতি নিরোধক স্থাপন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উভয় পাশে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, কেডিএস ডিপোর অবৈধ পার্কিং বন্ধ এবং মহাসড়ক ও রেললাইনের পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবিও জানান তাঁরা।

শিক্ষার্থীদের এসব দাবি মূলত একটি দুর্ঘটনার বিচার চাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের প্রাণহানি ঠেকানোর প্রত্যাশার প্রতিফলন। তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু দুর্ঘটনায় দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সড়কের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অবৈধ পার্কিং, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

অন্যদিকে অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও ছিল উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ সময় মহাসড়কে আটকে থাকা যাত্রীদের অনেককে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পণ্য পরিবহন ও জরুরি যাতায়াতেও বিঘ্ন ঘটে। তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রশাসনের আলোচনা এবং জেলা প্রশাসকের আশ্বাসের পর বিকেল ৪টার দিকে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়। এতে প্রায় ছয় ঘণ্টার অচলাবস্থার অবসান ঘটে।

অবরোধ প্রত্যাহার হলেও শিক্ষার্থীদের মূল উদ্বেগের সমাধান এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ, চালককে গ্রেপ্তার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের উদ্যোগ কত দ্রুত কার্যকর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান থাকলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

সীতাকুণ্ডের এই দুর্ঘটনা আবারও দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে পথচারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এনেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার সামনে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকলে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই শুধু দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা নয়, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পরিকল্পিত অবকাঠামো, নিয়মিত তদারকি এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মাইশা মুশফিরাতের মৃত্যুতে তাঁর পরিবার, সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কোনো প্রশাসনিক আশ্বাসে পূরণ হওয়ার নয়। তবে তাঁর মৃত্যুর পর উত্থাপিত নিরাপত্তার দাবিগুলো বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে অন্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে একই ধরনের বিপদের মুখে পড়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো দেওয়া আশ্বাসগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকায় নিরাপদ সড়ক ও রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com