গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সংস্কার পরিষদ চায় ছাত্রশক্তি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সংস্কার পরিষদ চায় ছাত্রশক্তি
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী অবিলম্বে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবি জানিয়েছে জাতীয় ছাত্রশক্তি। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, গণভোটে জনগণ যে প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে, সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিকল্প কোনো কাঠামোর মাধ্যমে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা জনরায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এক যৌথ বিবৃতিতে জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি আবু বাকের মজুমদার ও সাধারণ সম্পাদক তাহমীদ আল মুদ্দাসসীর চৌধুরী এসব দাবি জানান। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গণরায়ের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণার শামিল। এ কারণে কমিটির গঠন, কার্যক্রম কিংবা সুপারিশ—কোনোটিই তাঁদের সংগঠন স্বীকার করে না। তাঁদের মতে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সংবিধান পরিবর্তনের যে পথ নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন করে কোনো বিকল্প প্রক্রিয়া তৈরি করার সুযোগ নেই।

জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারা তাঁদের দাবির পক্ষে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল তুলে ধরেছেন। তাঁদের বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী, গণভোটে ৪ কোটি ৭২ লাখেরও বেশি ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। সংগঠনটির দাবি, এই ভোটের মাধ্যমে জনগণ ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন। ওই আদেশে সংবিধান সংস্কারের জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের যে প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটিই অনুসরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করে তারা।

বিবৃতিতে নেতারা বলেন, সংবিধান কীভাবে পরিবর্তন করা হবে, সে বিষয়ে জনগণ গণভোটের মাধ্যমে মতামত দিয়েছে। তাই সেই সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে সংসদে আলাদা একটি সংশোধন কমিটি গঠন করা গ্রহণযোগ্য নয় বলে তাঁদের অবস্থান। তাঁদের মতে, জনগণের ভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পরিবর্তে অন্য কোনো কাঠামোর মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা গণভোটের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

জাতীয় ছাত্রশক্তি ক্ষমতাসীন দলের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেছে। বিবৃতিতে সংগঠনটির নেতারা অভিযোগ করেন, সরকার জনগণের রায়কে পাশ কাটিয়ে জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। তাঁদের ভাষ্য, জনগণ সংস্কারের পক্ষে ভোট দিলেও সরকার দলীয় সুবিধা অনুযায়ী সংবিধানের বিভিন্ন বিষয় কাটছাঁট করে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিচ্ছে। তাঁরা এ ধরনের উদ্যোগকে জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি বলে উল্লেখ করেন।

তবে বিশেষ কমিটি গঠনের পক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সেটিও এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংসদীয় কমিটির নেতৃত্বে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এর আগে জানিয়েছেন, জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে সনদ বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। কমিটির আলোচনায় রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও শহীদ পরিবারের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছিল। কমিটির লক্ষ্য ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেওয়া।

এখানেই মূলত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক মতপার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে সরকার সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়ে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চাইছে। অন্যদিকে জাতীয় ছাত্রশক্তিসহ কয়েকটি সংগঠন মনে করছে, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমেই এ কাজ সম্পন্ন হওয়া উচিত। ফলে বিতর্কটি শুধু একটি কমিটি গঠন বা বৈঠকে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং গণভোটের ফল কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেই প্রক্রিয়া নিয়েই মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।

জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারা বিশেষ কমিটির কাঠামো নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, কমিটির সদস্য কারা, সেখানে কী আলোচনা হচ্ছে কিংবা কী ধরনের সুপারিশ তৈরি করা হচ্ছে—এসব বিষয় তাঁদের কাছে মুখ্য নয়। তাঁদের মতে, যে প্রক্রিয়ার ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে, সেই প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকে সংবিধান সংস্কারের সঠিক পথ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে তাঁরা বলেন, ‘ভুল ঘরে বসে সঠিক সংবিধান রচনা সম্ভব নয়।’ তাঁদের এই বক্তব্যে বিশেষ কমিটির বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংগঠনটির অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।

বিবৃতিতে জাতীয় ছাত্রশক্তি তিনটি প্রধান দাবি উত্থাপন করেছে। প্রথমত, সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কোনো সংশোধনী বিল আনা যাবে না। দ্বিতীয়ত, গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। তৃতীয়ত, ওই সংস্কার পরিষদের মাধ্যমেই জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, তাঁদের দাবির বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত নেই। বিশেষ কমিটির কোনো মতবিনিময় সভা, শুনানি কিংবা পরামর্শমূলক বৈঠকে জাতীয় ছাত্রশক্তি অংশ নেবে না বলেও তাঁরা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থাৎ কমিটির সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিবর্তে সংগঠনটি বাইরে থেকে তাদের দাবি তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এদিকে সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ কমিটির সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া এবং তা বর্জনের সিদ্ধান্ত—দুই ধরনের অবস্থানই সামনে এসেছে। কিছু সংগঠন সংসদীয় আলোচনার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার পক্ষে থাকলেও অন্যরা গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানাচ্ছে। ফলে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

সংবিধান একটি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা ও দায়িত্ব এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি। তাই সংবিধান পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের দেওয়া মতামত কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ, আইনি ব্যাখ্যা এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও পরিষ্কার করতে পারে।

জাতীয় ছাত্রশক্তির সাম্প্রতিক বিবৃতি সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সংগঠনটি বিশেষ কমিটির কার্যক্রম প্রত্যাখ্যান করে সরাসরি সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে সরকার সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে আলোচনা ও সুপারিশ তৈরির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় হবে কি না, কিংবা সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া কোন পথে এগোবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে গণভোটের রায়, জুলাই জাতীয় সনদ এবং সংসদীয় উদ্যোগের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com