রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চিকিৎসার বিল নিয়ে বিরোধের জেরে সিটি হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে এক রোগীর স্বজনদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় হাসপাতালের বিভিন্ন আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাটের অভিযোগও করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার রাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার একটি ভিডিও বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার বিল পরিশোধ নিয়ে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রথমে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে রোগী বিল পরিশোধ করে হাসপাতাল থেকে চলে গেলেও কিছুক্ষণ পর একদল যুবক সেখানে এসে হামলা ও ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে ঠোঁটে আঘাত পাওয়া এক রোগী চিকিৎসা নিতে মোহাম্মদপুরের সিটি হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আসেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পর তাঁর বিল নির্ধারণ করা হয় তিন হাজার টাকা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, রোগীর স্বজনরা ওই বিলের পরিমাণ কমানোর অনুরোধ জানান। এ নিয়ে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের তর্কবিতর্ক শুরু হয়।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও রোগী চিকিৎসার বিল পরিশোধ করে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এরপর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে কয়েকজন যুবক সেখানে এসে হামলা চালান। তাঁরা হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর করেন এবং মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
হামলার ঘটনায় হাসপাতালের বিভিন্ন সরঞ্জাম, আসবাবপত্র ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালটির সহকারী ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ উসমান গনি জানিয়েছেন, এ ঘটনায় আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তাঁর দাবি, হামলার কারণে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তদন্ত শুরু করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা জানিয়েছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থানায় অভিযোগ দিয়েছে। ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
পুলিশের এই বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার বিভিন্ন দিক যাচাই করা হচ্ছে। হামলায় কারা জড়িত ছিলেন, কী কারণে তাঁরা হাসপাতালে প্রবেশ করেছিলেন এবং ভাঙচুরের ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। তবে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় কিংবা কাউকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালের মতো একটি জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের হামলার অভিযোগ জননিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবার পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। হাসপাতাল শুধু চিকিৎসা গ্রহণের স্থান নয়, অসুস্থ ও আহত মানুষের জন্য জরুরি আশ্রয়স্থলও। সেখানে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী এবং তাঁদের স্বজনদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসার জন্য আসা রোগীদের ক্ষেত্রে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল থাকা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানে হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অন্য রোগীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। চিকিৎসাধীন রোগীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। এ কারণে চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানে বিরোধ বা অভিযোগ দেখা দিলে তা আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান করা জরুরি।
অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে রোগী ও স্বজনদের অসন্তোষও দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। অনেক পরিবার অসুস্থতার সময় আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ে। চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং হাসপাতালের অন্যান্য খরচ বহন করতে গিয়ে অনেকের জন্য অতিরিক্ত অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসার বিল নিয়ে প্রশ্ন বা আপত্তি দেখা দিলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উচিত রোগী ও স্বজনদের কাছে খরচের বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা।
একইভাবে রোগী ও স্বজনদেরও কোনো বিল নিয়ে আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ, আলোচনা কিংবা প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেওয়া প্রয়োজন। কোনো ধরনের হামলা, ভয়ভীতি, ভাঙচুর বা লুটপাটের অভিযোগ কখনোই বিরোধ নিষ্পত্তির গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা, সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখা এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি চিকিৎসার বিল নির্ধারণ ও বিভিন্ন সেবার মূল্য সম্পর্কে রোগীদের আগেই পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হলে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কমতে পারে। চিকিৎসা ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা রোগী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরিতেও সহায়ক।
মোহাম্মদপুরের সিটি হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগের পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
সব মিলিয়ে চিকিৎসার মাত্র তিন হাজার টাকার বিল নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধের পর একটি হাসপাতাল ভাঙচুরের অভিযোগ রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার তদন্ত করছে। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসার পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে হাসপাতাল ও রোগীদের মধ্যে যেকোনো বিরোধ যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়, সে জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত