মানব পাচার রোধে ১২ দেশে কর্মী পাঠাতে নতুন কড়াকড়ি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
মানব পাচার রোধে ১২ দেশে কর্মী পাঠাতে নতুন কড়াকড়ি
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিতে গিয়ে বাংলাদেশি কর্মীরা যাতে মানব পাচার, প্রতারণা, জোরপূর্বক শ্রম ও যুদ্ধের মতো ভয়াবহ ঝুঁকিতে না পড়েন, সে লক্ষ্যে অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় নজরদারি আরও কঠোর করেছে সরকার। রাশিয়াসহ ১২টি দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া এসব দেশে যেতে ইচ্ছুক কোনো কর্মীর অনুকূলে বহির্গমন ছাড়পত্র বা ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স দেওয়া যাবে না বলে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

গত বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান-৩ শাখা থেকে বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালকের কাছে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব গাজী মো. শাহেদ আনোয়ার স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় নির্দিষ্ট দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর আগে নিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই দিন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) তাদের সদস্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে বিষয়টি জানিয়ে সতর্ক করেছে। ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে এখন থেকে সরকারি অনুমোদনের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

নির্দেশনার আওতায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সার্বিয়া, মলদোভা, বেলারুশ, কসোভো, বসনিয়া, জাপান, ইরাক, লাওস, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইউক্রেন ও লিবিয়া। তবে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে দেশগুলোর তালিকায় কিছু অমিল দেখা গেছে। মূল নির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি যাচাই করে তালিকার চূড়ান্ত তথ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নতুন ব্যবস্থায় এসব দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যেতে ইচ্ছুক প্রত্যেক কর্মীর নিয়োগপ্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন যাচাইয়ের পরই বহির্গমন ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে বিএমইটি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আগে কয়েকটি নিয়োগের চাহিদাপত্রের জন্য মন্ত্রণালয়ের পৃথক অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। বিশেষ করে সাতটি পর্যন্ত নিয়োগের চাহিদাপত্রের ক্ষেত্রে যে সুযোগ ছিল, সেটিকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ভুয়া নিয়োগপত্র কিংবা বিভ্রান্তিকর চাকরির প্রস্তাব দেখিয়ে বিদেশে কর্মী পাঠানোর চেষ্টা করেছে। এতে একদিকে যেমন কর্মীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, অন্যদিকে বিদেশে গিয়ে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে আটকে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। নতুন নির্দেশনার ফলে প্রতিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী কর্মীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবিকার সন্ধানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় প্রতারণা, দালালচক্রের প্রভাব, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের মতো সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।

বিশেষ করে স্বল্প আয়ের পরিবারের অনেক মানুষ জমি বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে কিংবা স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ ধার করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। তাঁদের প্রত্যাশা থাকে, বিদেশে কাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করবেন, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করবেন এবং ঋণ পরিশোধ করবেন। কিন্তু চাকরির প্রলোভনে প্রতারিত হলে তাঁদের সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে গিয়ে চাকরি না পাওয়া, প্রতিশ্রুত বেতন না পাওয়া, পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া কিংবা জোরপূর্বক অন্য কাজে নিয়োজিত হওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় কর্মীদের।

কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামকে ঘিরে এ ধরনের ঝুঁকি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব দেশে বিভিন্ন প্রতারণামূলক চক্রের পরিচালিত স্ক্যাম কম্পাউন্ড বা অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রে বিদেশি নাগরিকদের আটকে রেখে জোরপূর্বক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। চাকরির বিজ্ঞাপন, উচ্চ বেতনের প্রলোভন কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আকর্ষণীয় কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনেককে এসব চক্রের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যেও এ ধরনের প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। বিদেশে গিয়ে চাকরির পরিবর্তে অনলাইন প্রতারণার কাজে বাধ্য হওয়া, স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ হারানো এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্যাতন ও মুক্তিপণের দাবির অভিযোগও উঠেছে। ফলে এসব দেশে কর্মসংস্থানের প্রস্তাব পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু চাকরির বিজ্ঞাপন কিংবা ভিসার ওপর নির্ভর না করে নিয়োগকর্তা, প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এবং কাজের প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়টি নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ায় কর্মসংস্থানের নামে বাংলাদেশি নাগরিকদের সামরিক কাজে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে। সাধারণ বেসামরিক চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে কর্মীদের রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে পরে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নির্মাণকাজ, কারখানার চাকরি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বৈদ্যুতিক কাজ কিংবা অন্যান্য সাধারণ পেশায় নিয়োগের কথা বলে কিছু বাংলাদেশিকে প্রলুব্ধ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

গত ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নাগরিকসহ ২৯টি দেশের মানুষকে প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তদন্তে বলা হয়েছে, অনেককে ভালো বেতনের বেসামরিক চাকরির আশ্বাস দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তাঁদের সামরিক কাজে যুক্ত করা হয়। এমনকি অনেককে রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়েছে, যে ভাষা তাঁরা বুঝতে পারতেন না। যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে অনেকের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে।

এ ছাড়া চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের যৌথ অনুসন্ধানেও বাংলাদেশি নাগরিকদের রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রতারণা ও জবরদস্তির অভিযোগ তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন নিয়োগকারী মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে সাধারণ চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কর্মীদের রাশিয়ায় নেওয়া এবং পরে সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। বিদেশে যাওয়া স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারগুলো তাঁদের জীবিত থাকা, অবস্থান কিংবা দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগে দিন কাটায়।
বাংলাদেশের সরকারি তথ্যেও রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া ৩০ জন বাংলাদেশিকে সামরিক অভিযানে জড়িয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে এবং তাঁদের মধ্যে অন্তত চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আটকে পড়া অন্য কর্মীদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের কথাও জানানো হয়েছিল। এসব ঘটনা বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ও মানব পাচারের ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছে।
তবে নতুন নির্দেশনার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ১২টি দেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থানের সব সুযোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বরং এসব দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন ও নিয়োগপ্রক্রিয়ার যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করা হচ্ছে। বৈধ নিয়োগকর্তা, প্রকৃত চাকরির চাহিদা এবং কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও রাশিয়া, মলদোভা ও জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়োগ অনুমোদনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ বহাল রয়েছে।
অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, নতুন নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভুয়া নিয়োগপত্র, অবৈধ মধ্যস্থতাকারী এবং প্রতারণামূলক কর্মসংস্থানের প্রস্তাব শনাক্ত করা সহজ হবে। তবে শুধু নির্দেশনা জারি করলেই প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, অনিয়মের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ সহজলভ্য করা জরুরি।

বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদেরও নিয়োগপত্র, চাকরির চুক্তি, বেতন-ভাতা, কাজের ধরন, ভিসার শ্রেণি এবং নিয়োগকর্তার পরিচয় ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্র নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর হাতে বড় অঙ্কের অর্থ তুলে দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। চাকরির নামে সামরিক কাজে নিয়োগ, চুক্তির বাইরে অন্য কাজ করানো কিংবা পাসপোর্ট আটকে রাখার মতো শর্ত থাকলে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

সব মিলিয়ে, রাশিয়াসহ ১২টি দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নতুন সরকারি নিয়ন্ত্রণ বিদেশগামী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে নজরদারি, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং প্রতারণাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ওপর। বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন যেন কোনো পরিবারের জন্য আর্থিক বিপর্যয় কিংবা প্রিয়জন হারানোর বেদনায় পরিণত না হয়, সে জন্য নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com