এক দিনে দুই দফা বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরি ২.৩০ লাখের কাছাকাছি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
এক দিনে দুই দফা বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরি ২.৩০ লাখের কাছাকাছি
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বাজারে আবারও বড় অঙ্কে বেড়েছে স্বর্ণের দাম। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণালংকার কেনা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৪৮২ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ টাকা। নতুন এই দর বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে।

স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে স্বর্ণালংকারের চাহিদা থাকে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের পরিবারের জন্য স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করা এখন আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণকে সঞ্চয় ও অলংকার—দুই হিসেবেই বিবেচনা করে আসছেন দেশের অনেক মানুষ। কিন্তু ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধিতে সেই পরিচিত বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার সকালে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বাজুস জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম বেড়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্বর্ণের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংগঠনটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের পাশাপাশি অন্যান্য মানের স্বর্ণের দামও বাড়ানো হয়েছে। ফলে সব ধরনের স্বর্ণালংকারের বাজারেই এর প্রভাব পড়বে।

নতুন মূল্যতালিকায় ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৩৪২ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হবে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৭৪ টাকায়। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪৮ টাকা। এসব দরের সঙ্গে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাজুসের ঘোষিত নতুন দরের ক্ষেত্রে অলংকার কেনার সময় ক্রেতাদের কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। স্বর্ণের নির্ধারিত বাজারদরের সঙ্গে অলংকারের নকশা ও তৈরির ধরন অনুযায়ী মজুরি প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ একই ওজনের স্বর্ণ দিয়ে তৈরি দুটি অলংকারের চূড়ান্ত দাম নকশা ও কারিগরি কাজের পার্থক্যের কারণে এক নাও হতে পারে। বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঘোষিত বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ভ্যাট যুক্ত থাকায় ক্রেতার কাছ থেকে আলাদাভাবে ভ্যাট আদায় করা যাবে না। ফলে কেনাকাটার সময় মূল্য পরিশোধের হিসাব বুঝে নেওয়া এবং রসিদে প্রতিটি খরচের বিবরণ যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোনো স্বর্ণালংকার পরিবর্তন বা বিক্রি করার ক্ষেত্রেও ক্রেতাদের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। বাজুসের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অলংকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ এবং ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ অর্থ বাদ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ফলে নতুন অলংকার কেনার সময় পুরোনো স্বর্ণের মূল্য হিসাব করতে গেলে নির্ধারিত কর্তনের বিষয়টি প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে যাঁরা পুরোনো গয়না বদলে নতুন গয়না নিতে চান, তাঁদের লেনদেনের আগে দোকান থেকে পূর্ণাঙ্গ হিসাব জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

স্বর্ণের বাজারে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ক্রেতাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর আগের দিন বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরিতে ৩ হাজার ৩২৪ টাকা বাড়িয়েছিল বাজুস। পরদিন বৃহস্পতিবার আবারও ৫ হাজার ৪৮২ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থাৎ দুই দিনের ব্যবধানে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরির দাম বেড়েছে মোট ৮ হাজার ৮০৬ টাকা। অল্প সময়ের মধ্যে এমন বৃদ্ধি স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করা পরিবারগুলোর বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

চলতি বছর দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম সমন্বয়ের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাজুসের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত মোট ১৩৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫ বার দাম বেড়েছে, ৬৭ বার কমেছে এবং একবার ভ্যাট সমন্বয় করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বছরজুড়েই স্বর্ণের বাজারে ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে। কখনো দাম বাড়ছে, আবার কখনো কমছে। ফলে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষকেই নিয়মিত বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।

স্বর্ণের দাম নির্ধারণে স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের মূল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে জানিয়েছে বাজুস। তেজাবি স্বর্ণ বলতে সাধারণত পরিশোধিত বা উচ্চ বিশুদ্ধতার স্বর্ণকে বোঝানো হয়, যা অলংকার তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর দাম বাড়লে স্বর্ণালংকার উৎপাদন ও বিক্রির ব্যয়েও প্রভাব পড়ে। তবে স্বর্ণের বাজারে কেবল স্থানীয় কাঁচামালের দামই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, মুদ্রার বিনিময় হার এবং চাহিদা-সরবরাহের মতো বিষয়ও সামগ্রিক মূল্যপরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।

স্বর্ণের দাম বাড়লেও দেশের বাজারে রুপার দাম অপরিবর্তিত রেখেছে বাজুস। বর্তমানে ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৪৯৯ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৩৮৩ টাকায়। ১৮ ক্যারেটের দাম ২ হাজার ৯১৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার প্রতি ভরির দাম ২ হাজার ২১৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বর্ণের তুলনায় রুপার দাম অনেক কম হওয়ায় অলংকার কেনার ক্ষেত্রে অনেক ক্রেতার কাছে এটি বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।

স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু গয়নার দোকানে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান, উপহার কিংবা ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে যাঁরা স্বর্ণ কেনেন, তাঁদের পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনতে হতে পারে। বিশেষ করে বিয়ের জন্য আগে থেকে নির্দিষ্ট বাজেট করে রাখা পরিবারগুলোকে এখন একই পরিমাণ স্বর্ণ কিনতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে। কেউ কেউ গয়নার ওজন কমাতে পারেন, আবার কেউ কেনাকাটা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে এসব সিদ্ধান্ত ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য, প্রয়োজন ও পারিবারিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

বাংলাদেশে স্বর্ণালংকারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব দীর্ঘদিনের। অনেক পরিবারে বিয়ের গয়না শুধু সাজসজ্জার উপকরণ নয়, বরং পারিবারিক সম্পদ ও ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার একটি অংশ হিসেবেও বিবেচিত হয়। আবার অনেকের কাছে স্বর্ণ কেনা দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের একটি উপায়। এ কারণে বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়লে তার প্রভাব সাধারণ ক্রেতাদের অনুভূতিতে দ্রুত পৌঁছে যায়। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি ও দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপের মধ্যে থাকা পরিবারগুলোর জন্য স্বর্ণের বাড়তি দাম নতুন হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন তৈরি করে।

তবে স্বর্ণের দাম বাড়ছে বলেই তাৎক্ষণিকভাবে কেনা বা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। যাঁদের অলংকার কেনা জরুরি, তাঁদের নির্ধারিত দর, মজুরি এবং বিনিময়সংক্রান্ত কর্তনের নিয়ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে কেনাকাটা করা উচিত। অন্যদিকে, সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে স্বর্ণ কিনতে চাইলে ব্যক্তিগত আর্থিক সক্ষমতা ও প্রয়োজন বিবেচনা করা জরুরি। বাজারদরের ওঠানামা অব্যাহত থাকায় ভবিষ্যতে দাম কোন দিকে যাবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে, এক দিনের ব্যবধানে দুই দফা মূল্যবৃদ্ধি দেশের স্বর্ণবাজারে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ টাকায় পৌঁছানোয় ক্রেতাদের ব্যয় আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে চলতি বছরে বারবার মূল্য সমন্বয়ের ঘটনা বাজারের অস্থিরতাও তুলে ধরছে। এখন ক্রেতাদের নজর থাকবে পরবর্তী সময়ে বাজুসের নতুন সিদ্ধান্ত এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দামের গতিপ্রকৃতির দিকে। স্বর্ণের দাম আরও বাড়বে, নাকি কমার প্রবণতা দেখা দেবে—তা নির্ভর করবে পরবর্তী বাজার পরিস্থিতি ও মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com