আর্থিক সংকটে ইবিতে চাকরি হারালেন ২৬৮ কর্মচারী

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
আর্থিক সংকটে ইবিতে চাকরি হারালেন ২৬৮ কর্মচারী
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সংকট ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে ২৬৮ জন ডে-লেবার ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও দপ্তরে দায়িত্ব পালন করে আসা এসব কর্মীর চাকরি হারানোর ঘটনায় তাঁদের জীবিকা ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের ভাষ্য, আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁদের বেতন-ভাতা বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে চাকরি হারানো কর্মীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

গত ১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭৬তম সিন্ডিকেট সভায় ২৬৮ জন কর্মচারীকে ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বুধবার (৪ নভেম্বর) বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মচারীর বেতন-ভাতা পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ইউজিসির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সিন্ডিকেট সভায় তাঁদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২৬৮ জন কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এক বছরের হিসাবে এই খাতে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে নিয়মিতভাবে এত বড় অঙ্কের ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এমনকি নিয়মিত কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতেও বিশ্ববিদ্যালয়কে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলে উপাচার্য জানিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সংকটের বিষয়টি নতুন নয়। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, নিজস্ব আয় ও বরাদ্দের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকায় নিয়মিত ব্যয় মেটাতে চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বেতন-ভাতা, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, প্রশাসনিক ব্যয় এবং অবকাঠামোগত প্রয়োজন মেটাতে অর্থের সংস্থান করতে হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত জনবলের বেতন বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন বিভাগ ও দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট রয়েছে। প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও ইউজিসির অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। এ পরিস্থিতিতে বিশেষ বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক এবং থোক বরাদ্দের আওতায় এসব কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে একাংশ পোষ্য কোটায় নিয়োগ পেয়েছিলেন।

নিয়োগের পর অনেক কর্মচারী দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ও বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করেছেন, কেউ দাপ্তরিক কার্যক্রম সচল রাখতে ভূমিকা রেখেছেন, আবার কেউ বিভিন্ন বিভাগে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন কাজ করলেও স্থায়ী নিয়োগ পাননি। ফলে চাকরির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে তাঁদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছিল।

এখন ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তাঁদের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হারানোর পাশাপাশি নতুন কাজ খুঁজে পাওয়া, পরিবারের নিয়মিত খরচ চালানো এবং আর্থিক দায়দেনা পরিশোধের মতো বিষয়গুলো তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং অন্য কোথাও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেননি, তাঁদের পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মচারীদের ভূমিকা শুধু প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীদের প্রয়োজন হয়। তাই একদিকে আর্থিক সংকট মোকাবিলা, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় জনবল ধরে রাখা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইউজিসির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সিন্ডিকেট সভায় কর্মচারীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিলে প্রয়োজনীয় অর্থ নেই। সরকার কিংবা ইউজিসি থেকেও এসব কর্মচারীর বেতন-ভাতা বহনের জন্য আলাদা বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের বেতন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি জানান।

উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মচারীর বেতন দিতে প্রতি মাসে প্রায় ২১ লাখ টাকা প্রয়োজন। গত মাসেও ঋণ করে কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতে হয়েছে। নিয়মিত আয় বা পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছাড়া এভাবে ধার করে দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা দেওয়া সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতি থাকায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে কাজ করার পরও সময়মতো বেতন না পাওয়া কর্মচারীদের জন্য কষ্টকর বলে স্বীকার করেছেন উপাচার্য। তাঁর বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি কর্মচারীদের পাওনা ও তাঁদের পরিস্থিতির বিষয়টিও উঠে এসেছে। প্রশাসনের সামনে এখন একদিকে বাজেটের ঘাটতি সামাল দেওয়া, অন্যদিকে চাকরি হারানো কর্মীদের পাওনা পরিশোধের দায়িত্ব রয়েছে।

ছাঁটাই হওয়া কর্মচারীদের আর্থিক পাওনা পরিশোধের বিষয়েও সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উপাচার্য জানিয়েছেন, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁদের গত তিন মাসের বকেয়া বেতন দেওয়া হবে। তবে এই অর্থ কবে এবং কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত সময়সূচি প্রকাশিত হয়নি।

চাকরি হারানোর পর কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। তাঁদের বিকল্প কোনো কাজে নিয়োগ, পুনর্বাসন কিংবা ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের সুযোগ রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন উপাচার্য। ফলে তিন মাসের বকেয়া বেতন পাওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা নিয়ে কর্মচারীদের উদ্বেগ কাটছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আর্থিক সংকটের বাস্তবতা যেমন বিবেচনার দাবি রাখে, তেমনি দীর্ঘদিন কাজ করা কর্মচারীদের জীবিকা ও মানবিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাঁদের পরিবার নিয়মিত বেতনের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের জন্য চাকরি হারানো কেবল একটি কর্মস্থল হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে আর্থিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পাশাপাশি কর্মীদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং সম্ভাব্য বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ইউজিসি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে কোনো বাস্তবসম্মত সমাধানের সুযোগ রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জনবল নিয়োগের বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। প্রয়োজনীয় জনবল থাকা সত্ত্বেও অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দের সীমাবদ্ধতায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ওপর নির্ভরতা তৈরি হলে ভবিষ্যতে কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি বাজেট পরিকল্পনা, নিজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সরকারি বরাদ্দের পর্যাপ্ততা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, আর্থিক সংকটের কারণে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬৮ জন ডে-লেবার ও কর্মচারীর চাকরি হারানোর সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্মী ও তাঁদের পরিবারের জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। প্রশাসন তিন মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধের কথা জানালেও বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত পরিকল্পনা নেই। ফলে এখন কর্মচারীদের প্রধান প্রত্যাশা পাওনা দ্রুত বুঝে পাওয়া এবং ভবিষ্যৎ জীবিকার বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট সমাধান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com