ভারতীয় ভিসায় নতুন অঙ্গীকারনামা, লাগবে যেসব তথ্য

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
ভারতীয় ভিসায় নতুন অঙ্গীকারনামা, লাগবে যেসব তথ্য
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতে ভ্রমণ, চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের ভিসা আবেদনের প্রক্রিয়ায় নতুন শর্ত যুক্ত করেছে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন। এখন থেকে দেশটির সব ধরনের ভিসার আবেদন জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত ফরম্যাটে ‘ভিসা আন্ডারটেকিং ফর্ম’ বা ভিসা অঙ্গীকারনামা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন এই নির্দেশনার ফলে ভারতীয় ভিসা প্রত্যাশীদের অনলাইন আবেদন সম্পন্ন করার পাশাপাশি অতিরিক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি পূরণ, স্বাক্ষর ও স্ক্যান করে জমা দিতে হবে। বিশেষ করে যারা পর্যটন, চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের আবেদন করার আগে নতুন নিয়মটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে।

গত ৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ভিসাসংক্রান্ত পোর্টালে প্রকাশিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে নতুন এই নির্দেশনার কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এখন থেকে সব শ্রেণির ভারতীয় ভিসা আবেদনকারীর জন্য নির্ধারিত ফরম্যাটে পূরণ করা ভিসা আন্ডারটেকিং ফর্ম জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ শুধু অনলাইনে ভিসার মূল আবেদনপত্র পূরণ করলেই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে না। এর সঙ্গে নির্ধারিত অঙ্গীকারনামাটিও যথাযথভাবে পূরণ করে জমা দিতে হবে।

হাইকমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, আবেদনকারীকে প্রথমে নির্ধারিত ফরম্যাটের ভিসা আন্ডারটেকিং ফর্ম সংগ্রহ করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ফর্মটি পূরণ করে তাতে স্বাক্ষর করতে হবে। পূরণ করা ফর্মটি স্ক্যান করে অনলাইন ভিসা আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। এ জন্য ব্যবহার করতে হবে ভারতের নির্ধারিত এনআইসি ভিসা অ্যাপ্লিকেশন পোর্টাল। হাইকমিশন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, কেবল তাদের নির্ধারিত ফরম্যাটের ফর্ম গ্রহণ করা হবে। অন্য কোনো ফরম্যাটে অঙ্গীকারনামা জমা দিলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে আবেদনকারীদের নিজেদের মতো করে কোনো ফর্ম তৈরি করা কিংবা বিকল্প কোনো নথি ব্যবহার করার সুযোগ থাকছে না।

নতুন এই অঙ্গীকারনামাটি এক পৃষ্ঠার হলেও এতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ঘোষণা দিতে হবে। ফর্মটির প্রথম অংশে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে। পাসপোর্টে যেভাবে নাম লেখা রয়েছে, ঠিক সেভাবেই পূর্ণ নাম উল্লেখ করতে হবে। পাশাপাশি পাসপোর্ট নম্বর, জাতীয়তা, জন্মতারিখ এবং বর্তমান ঠিকানা দিতে হবে। এসব তথ্য পূরণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন, কারণ পাসপোর্ট ও মূল ভিসা আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে অঙ্গীকারনামার তথ্যের অসামঞ্জস্য থাকলে আবেদন যাচাইয়ের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি আবেদনকারীকে ভারতে যাওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্যও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। কেউ পর্যটনের জন্য যেতে চাইলে পর্যটন, চিকিৎসার জন্য গেলে চিকিৎসা, ব্যবসায়িক কাজে গেলে ব্যবসা এবং কোনো সম্মেলনে অংশ নিতে গেলে সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করতে হবে। অর্থাৎ যে উদ্দেশ্যে ভিসার আবেদন করা হচ্ছে, অঙ্গীকারনামাতেও সেই একই উদ্দেশ্য ঘোষণা করতে হবে। ভিসার আবেদনে এক ধরনের উদ্দেশ্য দেখিয়ে বাস্তবে অন্য উদ্দেশ্যে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা হলে তা নতুন অঙ্গীকারনামার শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

ফর্মটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো আবেদনকারীর দেওয়া আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার। এতে আবেদনকারীকে ঘোষণা দিতে হবে, তিনি যে উদ্দেশ্যে ভারতে যাওয়ার অনুমতি চাইছেন, দেশটিতে অবস্থানকালে কেবল সেই উদ্দেশ্যেই ভ্রমণ করবেন। একই সঙ্গে আবেদন করার তারিখে তিনি ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের অধিক্ষেত্রের আওতাধীন এলাকায় বসবাস করছেন এবং আবেদনপত্রে দেওয়া সব তথ্য সত্য ও সঠিক বলে নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে ঠিকানার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আবেদনকারীকে নিজের বর্তমান আবাসিক ঠিকানা নির্ভুলভাবে উল্লেখ করতে হবে। নাম, পাসপোর্ট নম্বর, জন্মতারিখ কিংবা ঠিকানার মতো ব্যক্তিগত তথ্য লেখার সময় অনুমাননির্ভর কোনো তথ্য দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখে মূল নথির সঙ্গে মিলিয়ে তথ্য পূরণ করাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।

ভারত সফর শেষে দেশে ফিরে আসার বিষয়েও আবেদনকারীকে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভারত ত্যাগ করবেন এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশটিতে অবস্থান করবেন না—এমন প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভিসার নির্ধারিত মেয়াদ ও অনুমোদিত অবস্থানের শর্ত মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিদেশি দেশে অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করলে সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে। নতুন অঙ্গীকারনামায় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে আবেদনকারীদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরও স্পষ্টভাবে অবহিত করা হয়েছে।

শুধু দেশে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতিই নয়, ভারতে অবস্থানকালে দেশটির আইন, বিধিবিধান ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার ঘোষণাও দিতে হবে। আবেদনকারীকে অঙ্গীকার করতে হবে যে, তিনি সেখানে অবস্থানকালে প্রচলিত আইন মেনে চলবেন এবং কোনো ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত হবেন না। বিদেশে ভ্রমণের সময় স্থানীয় আইন ও নিয়মকানুন সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রত্যেক বিদেশি নাগরিকের দায়িত্ব। নতুন ফর্মে এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার ফলে আবেদনকারীদের কাছ থেকে ভ্রমণের উদ্দেশ্যের পাশাপাশি আইন মেনে চলার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতিও নেওয়া হচ্ছে।

হাইকমিশনের নির্ধারিত ফর্মে আরও সতর্ক করা হয়েছে, অঙ্গীকারনামায় উল্লেখ করা শর্ত ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভিসা বাতিল হতে পারে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ভারতীয় ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তার যোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ নতুন এই ফর্মটি কেবল আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রের অংশ নয়; বরং আবেদনকারীর দেওয়া তথ্য এবং ভ্রমণসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির একটি লিখিত ঘোষণা হিসেবেও বিবেচিত হবে।

অঙ্গীকারনামার শেষ অংশে আবেদনকারীকে নিজের স্বাক্ষর, ফর্ম পূরণের স্থান এবং তারিখ উল্লেখ করতে হবে। স্বাক্ষর ছাড়া কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য অসম্পূর্ণ রেখে ফর্ম জমা দিলে সেটি যথাযথভাবে পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাই ফর্মটি স্ক্যান করার আগে প্রতিটি ঘর ভালোভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্বাক্ষর, তারিখ এবং ব্যক্তিগত তথ্য যেন স্পষ্টভাবে দেখা যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনায় বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যেসব শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদন করবে, তাদের অঙ্গীকারনামায় মা-বাবা উভয়ের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে সন্তানের হয়ে ভিসার আবেদন করার সময় অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। একজন অভিভাবকের স্বাক্ষর দিয়ে ফর্ম সম্পন্ন করলেই প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হবে না।

বাংলাদেশিদের কাছে ভারত দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা, পর্যটন, ব্যবসা, শিক্ষা এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। বিশেষ করে উন্নত চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি, মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুর মতো শহরে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন অঙ্গীকারনামার শর্ত যুক্ত হওয়ায় এসব আবেদনকারীকেও আগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফর্মটি প্রস্তুত রাখতে হবে।

একইভাবে পর্যটক, ব্যবসায়ী এবং পারিবারিক প্রয়োজনে ভারতে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদেরও নতুন নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে যাদের ভ্রমণের তারিখ আগে থেকেই নির্ধারিত রয়েছে, তাদের শেষ মুহূর্তের জটিলতা এড়াতে আবেদন জমা দেওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ফর্ম সংগ্রহ ও পূরণ করে রাখা উচিত। পরিবারের একাধিক সদস্য একসঙ্গে ভ্রমণ করলেও প্রত্যেক আবেদনকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ও অঙ্গীকারের বিষয়টি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এদিকে ভারতীয় ভিসা আবেদনের বিদ্যমান অনলাইন পদ্ধতির সঙ্গে নতুন ফর্মটি অতিরিক্ত নথি হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ফলে আবেদনকারীদের মূল অনলাইন আবেদনপত্রের পাশাপাশি অঙ্গীকারনামা আপলোড করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তবে এই নতুন শর্তকে ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। ফর্ম জমা দেওয়া আবেদন প্রক্রিয়ার একটি বাধ্যতামূলক অংশ মাত্র; ভিসা অনুমোদনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

সব মিলিয়ে ভারতীয় ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য নতুন নির্দেশনাটি আবেদন প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। নির্ধারিত ফরম্যাট ব্যবহার, সঠিক ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান, ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য উল্লেখ এবং প্রয়োজনীয় অঙ্গীকার সম্পন্ন করার বিষয়গুলো এখন আরও বেশি গুরুত্ব পাবে। তাই আবেদনকারীদের উচিত তাড়াহুড়া না করে হাইকমিশনের নির্ধারিত ফর্ম সংগ্রহ করা, প্রতিটি তথ্য যাচাই করা এবং অনলাইন আবেদনের সঙ্গে সঠিকভাবে স্ক্যান করা কপি সংযুক্ত করা। সামান্য অসতর্কতা যেন দীর্ঘদিনের ভ্রমণ পরিকল্পনায় অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা তৈরি না করে, সে বিষয়ে প্রত্যেক আবেদনকারীকে সচেতন থাকতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com