ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে পদত্যাগের ঘোষণা প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্টের

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার
ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে পদত্যাগের ঘোষণা প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্টের
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে বেসরকারি উয়েনো ব্যাংকের আর্থিক বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে ভয়াবহ রাজনৈতিক ও আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির প্রায় ৩০ লাখ গ্রাহক নিজেদের জমা রাখা অর্থে প্রবেশাধিকার হারানোর পর দেশজুড়ে ক্ষোভ, বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা। তবে তাঁর পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পরও দেশটির পার্লামেন্টে অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।

গত ৫ নভেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান পেনা। তিনি বলেন, দেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক শান্তি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষার স্বার্থে তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকটির গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টিকে নিজের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রেখে যাঁরা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ জমা রেখেছেন, তাঁদের উদ্বেগ দূর করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পেনা নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে থাকলে তাঁদের কাছে ক্ষমা চান। তিনি বলেন, প্যারাগুয়ের মানুষের কল্যাণে কাজ করার সংকল্প নিয়েই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ইতিহাসই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে তাঁর এই বক্তব্যের পরও দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে সংকটের অবসান ঘটেনি। বরং পদত্যাগের ঘোষণার পর অভিশংসন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান উয়েনো ব্যাংক। কয়েক বছরের মধ্যে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে দেশটির অন্যতম পরিচিত ডিজিটাল ব্যাংকে পরিণত হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু আর্থিক হিসাব পর্যালোচনা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে গুরুতর দুর্বলতা ধরা পড়ার পর ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে বিপাকে পড়েন প্রায় ২৯ থেকে ৩০ লাখ গ্রাহক। অনেকেই নিজেদের ব্যাংক হিসাবের অর্থ ব্যবহার করতে পারছেন না। কারও কারও বেতন, পেনশন কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনের টাকা আটকে যাওয়ায় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২ নভেম্বরের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ৩ নভেম্বর উয়েনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে সংকট নিরসন বা রেজল্যুশন প্রক্রিয়া শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যালোচনায় দেখা যায়, আর্থিক হিসাব সংশোধনের পর ব্যাংকটির সচ্ছলতার অনুপাত বা সলভেন্সি রেশিও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা এবং সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার মূল্যায়নে এই সূচক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপের ফলে ব্যাংকটির গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়ে। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বেতন, ব্যবসায়িক আয়, ব্যক্তিগত সঞ্চয় কিংবা অবসরকালীন অর্থ জমা রেখেছিলেন, তাঁরা হঠাৎ করেই নিজেদের অর্থ ব্যবহারে বাধার মুখে পড়েন। প্যারাগুয়ের মতো প্রায় ৬১ থেকে ৬৫ লাখ মানুষের দেশে একটি ব্যাংকের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ হওয়ায় সংকটটির প্রভাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ, অনেক পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, চিকিৎসা, শিক্ষা ও খাদ্য কেনার অর্থ ব্যাংক হিসাবের ওপর নির্ভরশীল।

ব্যাংকটির সঙ্গে সরকারি অর্থের সংশ্লিষ্টতা সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে উয়েনো ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রাখা হয়েছিল। ব্যাংকটি প্রায় ৮০০ থেকে ৮৫০ কোটি ডলার নয়, বরং প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সরকারি তহবিল পরিচালনা করছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অর্থের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা ও পেনশন ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তহবিলও ছিল। ফলে সংকটটি শুধু ব্যক্তিগত আমানতকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সরকারি অর্থের নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট পেনার সঙ্গে ব্যাংকটির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিরোধী আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ, তাঁর শাসনামলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল অর্থ ব্যাংকটিতে জমা রাখা হয়েছিল এবং ব্যাংকটির সম্প্রসারণে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে। তাঁরা পেনার বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত, পেনশন তহবিলের অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম এবং ব্যাংকটির বিষয়ে যথাযথ তদারকি না করার অভিযোগ তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। পেনা নিজেও কোনো অন্যায়ের দায় স্বীকার করেননি। তাঁর বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বিচার আইন ও আদালতের মাধ্যমে হওয়া উচিত।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলের ৩৫ জন আইনপ্রণেতা এবং ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন ভিন্নমতাবলম্বী পেনার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেন। তাঁদের দাবি, প্রেসিডেন্ট গুরুতর ও ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন। শুরুতে রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকা পেনা নিজ দলের সমর্থনও হারাতে থাকেন। ক্ষমতাসীন কলোরাডো পার্টির প্রভাবশালী অংশের সমর্থন সরে যাওয়ায় তাঁর অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজধানী আসুনসিওনে ব্যাংকটির গ্রাহক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সাধারণ নাগরিকদের বিক্ষোভও পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে।

পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পরও পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে ভোট দেয়। উপস্থিত ৭৮ জন আইনপ্রণেতাই এ প্রক্রিয়ার পক্ষে ভোট দেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের ঘোষণা সত্ত্বেও তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। এখন সিনেটের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপ। পেনার পদত্যাগ গ্রহণ করা হবে, নাকি অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা নিয়ে দেশটিতে আলোচনা চলছে।

প্যারাগুয়ের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ গ্রহণ করা হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা দায়িত্ব নিতে পারেন। তবে অভিশংসন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এ পরিস্থিতি শুধু একজন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ছাড়ার ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহির বড় পরীক্ষা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

এদিকে আমানতকারীদের সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আমানত গ্যারান্টি ব্যবস্থার আওতায় নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত অর্থ সুরক্ষিত রয়েছে। দেশটির প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ৭৫টি ন্যূনতম মাসিক মজুরির সমপরিমাণ আমানত গ্যারান্টির আওতায় আসবে। বর্তমানে এই সীমা প্রায় ২২৮ কোটি ৩০ লাখ প্যারাগুয়ান গুয়ারানি। তবে এই সুরক্ষা প্রতিটি হিসাবের জন্য আলাদা নয়; একজন আমানতকারীর একই ব্যাংকে থাকা সব হিসাব মিলিয়ে নির্ধারিত সীমা প্রযোজ্য হবে। নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি ব্যাংকের সম্পদ ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানিয়েছে, উয়েনো ব্যাংকের সংকটকে পুরো প্যারাগুয়ের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাধারণ দুর্বলতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি নির্দিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংকট এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে আইনসম্মতভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির সম্পদ সংরক্ষণ, আর্থিক অবস্থার যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। একই সঙ্গে অনির্ভরযোগ্য তথ্য ও গুজবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার জন্য গ্রাহকদের সতর্ক করা হয়েছে।

তবে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন একটাই—তাঁদের সঞ্চয়ের টাকা কবে এবং কীভাবে ফেরত পাওয়া যাবে। যাঁরা ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ দিয়ে পরিবারের খাবার, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা ব্যবসার খরচ চালাতেন, তাঁদের জন্য প্রতিটি দিনই নতুন দুশ্চিন্তার। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা একবার নষ্ট হলে তা পুনরুদ্ধার করাও সহজ নয়। এ কারণে ব্যাংকটির সংকট নিরসনে দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।

২০২৩ সালের আগস্টে পাঁচ বছরের মেয়াদে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন সান্তিয়াগো পেনা। তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালে। কিন্তু উয়েনো ব্যাংকের আর্থিক বিপর্যয়, সরকারি অর্থের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন এবং অভিশংসনের উদ্যোগ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। এখন দেশটির সামনে একদিকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দায়িত্ব। এই দুই সংকট কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে প্যারাগুয়ের আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের ভবিষ্যৎ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com