বেতন বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের বিক্ষোভে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবারের (৫ নভেম্বর) দেশব্যাপী কর্মসূচিতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ৫৩ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ৪৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ৮৬টি ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশজুড়ে ৪৪৮ জনকে আটক করা হয়। আহত হন পুলিশের সদস্য ও জেন্ডারমেরির ৫৩ জন কর্মকর্তা। একই সময়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জরুরি সেবাদানকারী বাহিনীকে ৮৬ বার হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্যারিস, লিওঁ, রেন ও তুলুজসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে দেশজুড়ে অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে সরকারি বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকার ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসে ছিলেন প্রায় ৬৫ হাজার। দিনের শুরুতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ বলে প্রাথমিক হিসাব দেওয়া হলেও পরে তা সংশোধন করা হয়। অন্যদিকে দেশটির প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠন কনফেডারেশন জেনারেল দ্যু ট্রাভাই (সিজিটি) দাবি করেছে, বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১৫ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ। সংগঠনটির হিসাবে, শুধু প্যারিসেই উপস্থিত ছিলেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ বিক্ষোভকারী।
অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে এই ব্যবধান ফ্রান্সের চলমান সামাজিক অসন্তোষের ব্যাপ্তি নিয়েও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকার ও শ্রমিক সংগঠনের হিসাব আলাদা হলেও উভয় পক্ষের তথ্যেই স্পষ্ট, বৃহস্পতিবারের কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। তাঁদের দাবির কেন্দ্রে ছিল বেতন বৃদ্ধি, পেনশন সুবিধার উন্নয়ন, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা।
দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ জমছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, জ্বালানি ও দৈনন্দিন সেবার খরচ বেড়ে যাওয়ায় নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেতন ও পেনশন বাড়ছে না। ফলে কর্মজীবী মানুষকে আগের তুলনায় বেশি খরচ বহন করতে হলেও তাঁদের প্রকৃত আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এই পরিস্থিতিতে বেতন বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে কার্যকর সরকারি উদ্যোগের দাবি জোরালো হয়েছে।
বিক্ষোভে শুধু কর্মজীবী শ্রমিকেরা নন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সরকারি কর্মচারী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও অংশ নেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন, শিক্ষক ও কর্মীসংকট, শ্রেণিকক্ষের অবস্থা এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সমস্যা ও পর্যাপ্ত কর্মী না থাকার অভিযোগ থেকে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় শিক্ষা খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর দাবি। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি বৃহত্তর শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে একীভূত হয়ে দেশব্যাপী অসন্তোষের রূপ নেয়।
বৃহস্পতিবারের ধর্মঘটের প্রভাব পড়ে শিক্ষা ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে। কয়েকটি শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবরোধের ঘটনা ঘটে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচির কারণে বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশে কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে পরিবহন ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়ে। ট্রেন ও মেট্রোরেল চলাচলে বিঘ্ন, বন্দর কার্যক্রমে সমস্যা এবং বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতে ভোগান্তির খবর পাওয়া যায়। ফলে কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ না নেওয়া সাধারণ মানুষও এর প্রভাব অনুভব করেন।
রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশ বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করে। দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করেন। অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সংঘর্ষের সময় কোথাও কোথাও পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। কিছু এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে লিওঁ, রেন, তুলুজ ও মার্সেইয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
সিজিটি ইউনিয়নের মহাসচিব সোফি বেনে ধর্মঘটকে অত্যন্ত কার্যকর বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, বেতন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি না হলে সাধারণ কর্মজীবী মানুষের সংকট আরও বাড়বে। শ্রমিক সংগঠনগুলো বিশেষ করে ন্যূনতম মজুরি ও পেনশন বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহন খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন না থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিক্ষোভের চাপের মুখে সরকার শ্রমিক সংগঠন ও নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু আগামী সোমবার শ্রমিক সংগঠন এবং নিয়োগকর্তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সামাজিক সম্মেলনের আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন। সেখানে বেতন, ক্রয়ক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলো আলোচনার পাশাপাশি বাস্তব ও কার্যকর সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা করছে।
ফ্রান্সের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এই আন্দোলনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইউরোজোনের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে দেশটি একদিকে সরকারি ব্যয় ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের চাপে রয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিও জোরালো হচ্ছে। সরকারি ব্যয় সংকোচনের উদ্যোগ এবং জনসেবায় অর্থায়ন নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে সরকারের সামনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং জনগণের ক্রমবর্ধমান দাবির মধ্যে সমন্বয় করার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভ ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সরকারি সেবার মতো বিষয়গুলো রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্তমান অসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি কতটা পূরণ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে ফ্রান্সে বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভ শুধু বেতন বৃদ্ধির দাবিতে একটি দিনের কর্মসূচি ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষা, পেনশন, কর্মসংস্থান ও জনসেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। একদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ আন্দোলনের ব্যাপকতা তুলে ধরেছে, অন্যদিকে সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তারের ঘটনা পরিস্থিতির জটিলতাও প্রকাশ করেছে। এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আলোচনার মাধ্যমে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া, যাতে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার চাপ কমে, আবার দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত