খুলনা, মুন্সীগঞ্জ, নড়াইল ও রাজধানী ঢাকায় পৃথক ঘটনায় চারজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। খুলনার ডুমুরিয়ায় চায়ের দোকানে বসে থাকা এক ঘের ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত তরিকুল ইসলাম শেখ স্থানীয় বিএনপি নেতার ছেলে। মুন্সীগঞ্জে পূর্ববিরোধের জেরে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। নড়াইলে পারিবারিক বিরোধের ঘটনায় ছেলের হাতে বাবা নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর রাজধানীর শাহজাহানপুরে ছোট ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেছে বড় ভাইয়ের। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পৃথক ঘটনাগুলোর পেছনের কারণ, অভিযুক্তদের ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
খুলনার ডুমুরিয়ায় নিহত তরিকুল ইসলাম শেখ (৩৫) স্থানীয় ঘের ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি রংপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুস সালাম শেখের ছেলে। বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার রংপুর ইউনিয়নের থুকড়া বাজারসংলগ্ন এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে একটি চায়ের দোকানে বসে চা পান করছিলেন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় মোটরসাইকেলে করে দুজন ব্যক্তি সেখানে আসে। তাঁদের একজন তরিকুলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। হামলাকারীরা দ্রুত মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।
স্থানীয়দের বর্ণনায়, ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে উপস্থিত ব্যক্তিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই হামলাকারীরা এলাকা ছেড়ে চলে যায়। দিনের বেলায় জনসমাগমপূর্ণ একটি চায়ের দোকানে এভাবে একজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে স্বজন ও স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করে।
নিহত তরিকুলের বাবা আবদুস সালাম শেখ জানান, বৃহস্পতিবার তিনি খুলনায় প্রধানমন্ত্রীর একটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। সেখানেই ছেলের হত্যার খবর পান। আকস্মিক এ ঘটনায় তিনি শোকাহত হয়ে পড়েন। ছেলের হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার হাফিজুর রহমান জানান, হত্যাকাণ্ডের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারা এবং কী উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা জানতে পুলিশ কাজ করছে। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশি অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরকেওয়ার ইউনিয়নের ভিটিহোগলা গ্রামে জাহেদ বেপারী (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) রাত পৌনে ১০টার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, জাহেদ বেপারীর সঙ্গে ফরিদ বেপারী নামের এক ব্যক্তির দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। পূর্ববিরোধের জেরেই এ হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। তবে বিরোধের প্রকৃত কারণ এবং হত্যাকাণ্ডে কারা সরাসরি জড়িত, তা এখনো তদন্তাধীন।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহেদ বেপারী আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন এবং সাবেক সংসদ সদস্য ফয়সাল বিপ্লবের সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে এলাকায় কোনো বিরোধ ছিল কি না, সে বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পর অভিযুক্ত ফরিদ ও তাঁর সহযোগীরা স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের অবস্থান বদলে জাহেদকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছিলেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এ ছাড়া স্থানীয়দের কেউ কেউ ব্যক্তিগত বিরোধের কথাও উল্লেখ করেছেন। পূর্ববিরোধের পাশাপাশি স্থানীয় একটি মাজারে ওরস আয়োজনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব কারণের কোনটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মুন্সীগঞ্জ সদর থানার পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে পূর্ববিরোধের বিষয়টি সামনে রেখে তদন্ত চলছে। প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে একাধিক দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় পারিবারিক বিরোধের জেরে আফসার শেখ (৫৫) নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর ছেলে খায়রুল শেখের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়নের বয়রা দক্ষিণপাড়া গ্রামে নিজেদের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ছেলে পলাতক রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, খায়রুল শেখের সঙ্গে তাঁর মা-বাবার প্রায়ই পারিবারিক বিষয় নিয়ে বিরোধ হতো। মাদকের টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বাড়িতে অশান্তি তৈরি হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে বাবার কাছে টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে আবারও কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে খায়রুল ঘরে থাকা বঁটি দিয়ে তাঁর বাবাকে আঘাত করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময় বাড়িতে তাঁর মা ও স্ত্রী উপস্থিত ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
গুরুতর আহত আফসার শেখকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর অভিযুক্ত খায়রুল শেখ পালিয়ে যান। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। তবে পারিবারিক বিরোধের প্রকৃত পরিস্থিতি, ঘটনার সময় কী ঘটেছিল এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
পরিবারের ভেতরে দীর্ঘদিনের বিরোধ যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় পরিবারের সদস্যদের। নড়াইলের এ ঘটনায় একজন বাবার মৃত্যুতে পরিবারটি গভীর সংকটে পড়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ছেলে পলাতক থাকায় ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং তাঁর বক্তব্যও এখনো পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে রাজধানীর শাহজাহানপুরের শান্তিবাগ এলাকায় ছোট ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে সাইফুল ইসলাম সাইফ (২৩) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দুই ভাইয়ের মধ্যে সামান্য বিষয় নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে এ ঘটনা ঘটে। পরে গুরুতর আহত সাইফকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ছোট ভাই সাইমকে আটক করেছে পুলিশ।
শাহজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিরুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই ভাই একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখছিলেন। এ সময় ছোট ভাই সাইমের পা বড় ভাই সাইফের গায়ে লাগে। বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। সাইফ অভিযোগ করেন, তাঁকে লাথি মারা হয়েছে। এ নিয়ে উত্তেজনার একপর্যায়ে তিনি ছোট ভাইকে চড় মারেন বলে জানা গেছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সাইম বাসায় থাকা একটি ছুরি দিয়ে বড় ভাইয়ের গলায় আঘাত করেন বলে পুলিশের ভাষ্য।
গুরুতর আহত সাইফকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর পুলিশ অভিযুক্ত সাইমকে আটক করে। সামান্য পারিবারিক বিরোধ থেকে এমন প্রাণঘাতী পরিণতি দুই ভাইয়ের পরিবারের জন্য গভীর শোক ও বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও আইনি প্রক্রিয়া তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসবে।
চারটি ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ঘটলেও প্রতিটিতেই প্রাণহানির পেছনে রয়েছে সহিংসতা। কোথাও দুর্বৃত্তের গুলিতে, কোথাও পূর্ববিরোধের জেরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে, আবার কোথাও পারিবারিক বিরোধের একপর্যায়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধ—যে কারণেই সংঘাত তৈরি হোক, তা সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই আইনসম্মত উপায়ে সমাধানের সুযোগ থাকা জরুরি। তবে প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
এখন চারটি ঘটনার তদন্তে পুলিশের ভূমিকা, অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং আদালতের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। নিহতদের পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়—এটাই সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত