আইআইবি ও এনডিবি থেকে ৭৫ মিলিয়ন ডলারের ঋণ পাচ্ছে সিটি ব্যাংক

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৮ বার
আইআইবি ও এনডিবি থেকে ৭৫ মিলিয়ন ডলারের ঋণ পাচ্ছে সিটি ব্যাংক

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ‘২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক সিটি ব্যাংক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের স্বীকৃতি ও আস্থার প্রতীক হিসেবে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি)-এর কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। দুই আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে সিটি ব্যাংককে দিচ্ছে মোট ৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৯০০ কোটি টাকার সমান। এই অর্থায়নের মধ্যে এআইআইবি এককভাবে দিচ্ছে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এনডিবি দিচ্ছে ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চুক্তিটি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে এবং এটিকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য এক ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সিটি ব্যাংক বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই অর্থায়ন বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের প্রকল্পগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সরবরাহ করবে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, জ্বালানি দক্ষতা, ই-মোবিলিটি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ আরও ত্বরান্বিত হবে। উন্নয়নশীল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যেখানে অবকাঠামোগত ঘাটতি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে এআইআইবি ও এনডিবির এই অর্থায়ন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চুক্তি সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন, এআইআইবির ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস অ্যান্ড ফান্ডস ক্লায়েন্টস বিভাগের মহাপরিচালক গ্লোবাল গ্রেগরি লিউ, এনডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সিওও রোমান সেরভ এবং মহাপরিচালক বিন হান। এছাড়া সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হোলসেল ব্যাংকিং প্রধান মেসবাউল আসীফ সিদ্দিকীসহ উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন।

এআইআইবি, যা চীনের বেইজিংয়ে সদর দপ্তর স্থাপন করে ২০১৬ সালে কার্যক্রম শুরু করে, এশিয়ার টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে এনডিবি, যা মূলত ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা মিলে গঠন করে—বিশ্বব্যাপী উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। বাংলাদেশ এই দুই প্রতিষ্ঠানেরই সদস্য দেশ। ফলে সিটি ব্যাংকের জন্য এই অর্থায়ন কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং কূটনৈতিক ও আর্থিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি নতুন মাত্রা যোগ করল।

সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও মাসরুর আরেফিন বলেন, এআইআইবি ও এনডিবির সঙ্গে এই দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। তার ভাষায়, “এই অর্থায়ন আমাদের প্রতি তাদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ, একই সঙ্গে এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগকে আরও ত্বরান্বিত করবে। দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এ ধরনের বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বড় আকারের তহবিলের ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব খাতগুলোতে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি গ্রহণ ক্ষমতা সীমিত। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পাওয়া সিটি ব্যাংকের জন্য বড় সাফল্য। এই ঋণের মাধ্যমে ব্যাংকটি বিদ্যমান প্রকল্পগুলোতে গতি আনতে পারবে, একই সঙ্গে নতুন প্রকল্প শুরু করার পথও সুগম হবে।

অন্যদিকে, এই ঋণটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি মাইলফলক কারণ এটি সার্বভৌম গ্যারান্টি ছাড়া এআইআইবির প্রদত্ত প্রথম ঋণ। সাধারণত আন্তর্জাতিক অর্থায়ন পেতে সরকারি গ্যারান্টি প্রয়োজন হয়, কিন্তু সিটি ব্যাংক নিজস্ব সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে এই ঋণ অর্জন করেছে। এতে বোঝা যায়, সিটি ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃত হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিটি ব্যাংক তার ব্যবসা সম্প্রসারণে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে কর্পোরেট ব্যাংকিং, ট্রেড ফাইন্যান্স, এসএমই ও খুচরা ব্যাংকিং খাতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি প্রমাণ করে যে, তারা কেবল স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক অঙ্গনেও নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই ঋণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ মানে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বরং পরিবেশ সুরক্ষা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটছে, এই অর্থায়ন সেই যাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

ডিজিটাল অবকাঠামো খাতেও এই ঋণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। ইন্টারনেট সংযোগ, ডাটা সেন্টার, ফিনটেক সলিউশন এবং ই-মোবিলিটির মতো খাতে বিনিয়োগ বাড়লে তা সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।

এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এআইআইবি ও এনডিবির এই ঋণ শুধু সিটি ব্যাংকের জন্য নয়, বরং পুরো দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সঙ্কেত। ভবিষ্যতে অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত হবে। এতে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে মূলধন বিনিয়োগ আরও বাড়বে এবং দেশের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সহায়ক হবে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, এই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। টেকসই উন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন না হলে প্রত্যাশিত সুফল আসবে না। সেক্ষেত্রে সিটি ব্যাংককে অবশ্যই তাদের দায়বদ্ধতা ও সুনামের জায়গা বজায় রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এআইআইবি ও এনডিবির সঙ্গে এই চুক্তি বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি কেবল একটি ঋণ নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও সম্ভাবনার স্বীকৃতি। দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পথে এগিয়ে নিতে এই ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত