প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আবারও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতিতে যদি ভোট অনুষ্ঠিত হয়, তবে দেশে ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান ঘটবে এবং কালো টাকার প্রভাব আরও ভয়াবহভাবে বিস্তৃত হবে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ পৌরসভা মাঠে আয়োজিত এক গণসমাবেশে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি এই মন্তব্য করেন।
চরমোনাই পীর বলেন, “যে নির্বাচন পদ্ধতিতে জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত হয় না, সেটি কখনোই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে না। বরং সেই পদ্ধতি ধনীদের ক্ষমতায় থাকার পথকে আরও মজবুত করে দেয়।” তিনি আরও দাবি করেন, দেশে বর্তমানে যে ধরনের নির্বাচনী ব্যবস্থা বিদ্যমান, তা গণতন্ত্রের নামধারী একপ্রকার স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের নামে জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রভাবশালীদের সিদ্ধান্ত, যেখানে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেবলমাত্র কাগজে সীমাবদ্ধ।
তিনি পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতিতে সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা আগেই বলেছি, পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়ন করলে জনগণের প্রতিনিধিত্ব সঠিকভাবে প্রতিফলিত হবে। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারকরা যদি সেটি না মানে, আমরা গণভোটের মাধ্যমে আমাদের দাবি জনগণের সামনে উপস্থাপন করব। সরকার যদি জনগণের মতামতকে অবজ্ঞা করে, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদেরও পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
গণতন্ত্র রক্ষায় জনগণের সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানিয়ে চরমোনাই পীর বলেন, “দেশের মানুষকে এখন জেগে উঠতে হবে। ভোটের অধিকার রক্ষায় সবাইকে একসাথে আন্দোলন করতে হবে। নির্বাচনের নামে যদি প্রহসন হয়, তাহলে জনগণ কখনোই তা মেনে নেবে না।”
গণসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলা সভাপতি মহিব উদ্দিন আহমেদ সোহেল। সাধারণ সম্পাদক সামছুল হুদার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন মুফতি তাজুল ইসলাম, মাহমুদুল হাসান, মঈন উদ্দিন খান তানভির, আব্দুল মোছাব্বির রুনু, সোলায়মান গাজীসহ দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। বক্তারা সবাই একবাক্যে বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া দেশে স্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
চরমোনাই পীর আরও বলেন, “দেশে এখন এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যেখানে নির্বাচনের নামে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করছে। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন আজ স্বাধীনতার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাবের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।” তিনি দাবি করেন, এভাবে চলতে থাকলে জনগণের আস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়বে এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকবে না।
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা চাই, এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হোক যেখানে কোনো দল বা গোষ্ঠী নয়, বরং জনগণ হবে ক্ষমতার আসল উৎস। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের অংশগ্রহণ। সেই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে নিরপেক্ষ প্রশাসন, জবাবদিহিমূলক নির্বাচন কমিশন এবং ন্যায্য ভোটের পরিবেশের মাধ্যমে।”
সভায় চরমোনাই পীর দলের আসন্ন সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকাও ঘোষণা করেন। হবিগঞ্জ জেলার চারটি সংসদীয় আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়— হবিগঞ্জ-১ আসনে মুফতি তাজুল ইসলাম, হবিগঞ্জ-২ আসনে মাওলানা শেখ হাদিসুর রহমান রুহানী, হবিগঞ্জ-৩ আসনে মুহিব উদ্দিন আহমেদ সোহেল এবং হবিগঞ্জ-৪ আসনে কামাল উদ্দিন আহমদকে। তিনি বলেন, “এই প্রার্থীরা কেবল রাজনীতি করতে আসেননি, তারা এসেছেন জনগণের সেবা ও ইসলামি মূল্যবোধকে ভিত্তি করে একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে।”
রেজাউল করিম সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে আগে ন্যায়ভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। মানুষকে কথা বলার স্বাধীনতা দিতে হবে, তাদের ভোটের মূল্য দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করে বা ভয় দেখিয়ে কখনোই স্থায়ী শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা সহিংসতার রাজনীতি চাই না। আমরা চাই জনগণের ভোটের মাধ্যমে একটি যোগ্য ও ন্যায়ভিত্তিক সরকার প্রতিষ্ঠা হোক। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতি ক্ষমতা দখলের নয়, বরং মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম করার রাজনীতি।”
চরমোনাই পীরের এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই তার বক্তব্যকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে পিআর পদ্ধতি ও গণভোট প্রসঙ্গে তার মন্তব্যকে নতুন এক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এখন দেশের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করার চেষ্টা করছে। চরমোনাই পীরের এই বক্তব্য সেই প্রচেষ্টারই ধারাবাহিকতা। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তারা শুধুমাত্র ধর্মীয় দল নয়, বরং নীতিনিষ্ঠ ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির পক্ষে একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে চাইছে।
হবিগঞ্জের এই গণসমাবেশের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শুধু দলীয় অবস্থান প্রকাশ করেনি, বরং দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে একটি বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তাধারার ইঙ্গিত দিয়েছে— যেখানে ভোটের মূল্য, গণতন্ত্রের মর্যাদা এবং জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারই মুখ্য হয়ে উঠেছে।