গাজায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান, শান্তির ঘোষণা ট্রাম্পের

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৮ বার
গাজায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান, শান্তির ঘোষণা ট্রাম্পের

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজার ধ্বংসস্তূপের উপর ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব পেল এক নতুন খবর—দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলা ইসরাইল–হামাস যুদ্ধের অবসান ঘটেছে। রক্ত, ধ্বংস আর অসীম মানবিক বিপর্যয়ের এই অধ্যায়ের ইতি টেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, “গাজায় যুদ্ধ শেষ হয়েছে।” সোমবার, ১৩ অক্টোবর, মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এই দিনটি নতুন করে স্থান করে নিল—যে দিন বন্দুক থেমেছে, বোমা স্তব্ধ হয়েছে, এবং দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের পর ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিরা একটুখানি শান্তির নিশ্বাস ফেলেছে।

এই শান্তির প্রতীক হয়ে এসেছে বন্দি বিনিময়ের সেই চিত্র, যা বিশ্বের কোটি মানুষের চোখে অশ্রু এনেছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে হামাস জীবিত জিম্মিদের ইসরাইলের হাতে তুলে দেয়। রেড ক্রসের মাধ্যমে গাজা থেকে ২০ জন জীবিত ইসরাইলি জিম্মি হস্তান্তরের পর ইসরাইলি সেনাবাহিনী নিশ্চিত করে, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে নিরাপদে। পাশাপাশি হামাস মৃত জিম্মিদের মরদেহ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে।

তেল আবিবের কেন্দ্রস্থলে ‘জিম্মি স্কয়ার’-এ হাজারো মানুষ অপেক্ষা করছিলেন প্রিয়জনদের ফেরার খবরের জন্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই অপেক্ষা যখন অবশেষে আশায় রূপ নেয়, তখন জনতার চোখে অশ্রু, মুখে হাসি, আর বুকভরা আলিঙ্গনে ভেসে যায় পুরো শহর। অনেকের হাতে ছিল হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের ছবি, কেউবা পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাঁদতে কাঁদতে। যুদ্ধের ভয়াবহতা ছাপিয়ে এই মানবিক মুহূর্ত যেন এক নতুন সূচনার বার্তা দিল।

অন্যদিকে গাজার সীমান্তে দেখা গেল এক ভিন্ন দৃশ্য। ইসরাইলি কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত দুই হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বন্দিকে বহনকারী বাস যখন গাজায় প্রবেশ করে, তখন হাজার হাজার মানুষ স্বজনদের বরণ করে নিতে ভিড় জমান। কেউ কাঁদছেন আনন্দে, কেউ মায়ের কোলে ফিরছেন বছরের পর বছর পর, কেউ বা সন্তানের মাথায় হাত রাখছেন প্রথমবারের মতো। গাজার রাস্তায় সেই দিন মানবতার বিজয়ের উৎসবের মতো এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

এই ঐতিহাসিক বিনিময়ের মধ্য দিয়েই ঘোষণা আসে ট্রাম্প প্রশাসনের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে সফরে গিয়ে সরাসরি ইসরাইলের পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এ ভাষণ দেন। তাঁর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় এক যুগের শেষ অধ্যায়ের ঘোষণা—“আকাশ এখন শান্ত, বন্দুক নীরব, সাইরেন থেমে গেছে। অবশেষে পবিত্র ভূমিতে শান্তি ফিরে এসেছে।” ট্রাম্প বলেন, “এই যুদ্ধ ছিল এক দুঃস্বপ্ন, যা শেষ হলো ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি উভয় জনগণের জন্য নতুন আশার দ্বার খুলে।”

ভাষণ শেষে ট্রাম্প মিশরের শারম আল–শেখ শহরে ‘শান্তি সম্মেলনে’ যোগ দেন, যেখানে মিশর, কাতার, তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল গাজায় যুদ্ধবিরতি টেকসই করা এবং ভবিষ্যতে স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করা। উদ্বোধনী ভাষণে ট্রাম্প বলেন, “আজ আমরা শুধু যুদ্ধের অবসান উদযাপন করছি না, আমরা মানবতার জয় ঘোষণা করছি।” এরপর মিশর, কাতার ও তুরস্কের নেতাদের সঙ্গে একত্রে গাজা শান্তিচুক্তি বিষয়ে একটি দলিলে স্বাক্ষর করেন তিনি।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, গত কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে গোপন আলোচনার পরিসর বাড়ানো হয়। তীব্র লড়াই, পারস্পরিক অবিশ্বাস, এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও আলোচনার অগ্রগতি হয় ধীরে ধীরে। বিশেষ করে গাজায় মানবিক বিপর্যয় এবং ইসরাইলের ভেতরে বাড়তে থাকা জনঅসন্তোষ দুই পক্ষকেই সমঝোতার দিকে নিয়ে আসে।

গত দুই বছরে গাজায় নিহত হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ, আহত হয়েছে আরও কয়েকগুণ। হাসপাতাল, স্কুল, এমনকি জাতিসংঘের ত্রাণকেন্দ্রও নিরাপদ ছিল না। লাখ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়ে আশ্রয় নিয়েছে সীমান্তবর্তী এলাকায়। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ২১ শতকের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট বলে অভিহিত করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের শান্তি ঘোষণা শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং এক মানবিক বার্তাও বয়ে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বিভক্তির নীতি অনুসরণ করেছে বলে অভিযোগ ছিল। কিন্তু এই সমঝোতা চুক্তিতে ট্রাম্প নিজেকে ‘শান্তির মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। নেসেটে ভাষণ শেষে তিনি বলেন, “ইসরাইল ও ফিলিস্তিন উভয়ের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার এখনই সময়। আমি চাই, এই ভূমি যুদ্ধের নয়, মানবতার প্রতীক হয়ে উঠুক।”

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের অবসান ঘোষণার পরও পরিস্থিতি এখনো নাজুক। গাজার প্রশাসনিক কাঠামো, পুনর্গঠন পরিকল্পনা, এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোর দাবি, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাকে পুনর্গঠনে অন্তত ৫০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।

ইসরাইলি রাজনীতিতেও এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিরোধীদলগুলো বলছে, বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করা মানে হামাসের কাছে আত্মসমর্পণ। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বলছে, “যদি আমাদের সন্তানরা বেঁচে থাকে, তাহলে এটিই সবচেয়ে বড় জয়।”

ফিলিস্তিনের গাজা সিটি থেকে এক তরুণ বলেন, “আমরা শুধু শান্তি চাই। আমাদের শিশুরা যেন বোমার শব্দে নয়, পাখির কণ্ঠে ঘুম ভাঙায়।” তাঁর এই কথাই যেন দুই বছরের রক্তাক্ত ইতিহাসের উপর এক মানবিক প্রার্থনা হয়ে উঠেছে।

আজ যখন গাজার আকাশে ধোঁয়ার পর্দা সরে গিয়ে সূর্যের আলো পড়ছে ধ্বংসস্তূপে, তখন নতুন করে জেগে উঠছে আশার গান। শান্তির এই সূচনা টেকসই হবে কিনা, তা ভবিষ্যৎই বলবে। তবে এই মুহূর্তে, যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে ক্লান্ত মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ যেন দীর্ঘদিন পর কিছুটা নিঃশ্বাস নিতে পারছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষায়, “আজকের দিনটি মানবতার জন্য, ভবিষ্যতের জন্য, আর সেই পৃথিবীর জন্য, যেখানে যুদ্ধ নয়—শান্তিই একমাত্র বিজয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত