প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তুতি তুঙ্গে। এরই মধ্যে নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনী কি ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার অর্থাৎ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ক্ষমতা পাবে কি না—এ বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত জানানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যে ছিল সাবধানী সুর, ছিল স্বচ্ছতার অঙ্গীকার। তিনি জানান, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা ও ক্ষমতা নিয়ে। জনগণের এই আগ্রহ অস্বাভাবিক নয়, বরং গণতান্ত্রিক পরিবেশে এটি স্বাভাবিক—তাই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যও ছিল পরিমিত ও পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারসাম্যপূর্ণ।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, সেনাবাহিনীর ভূমিকা যে গুরুত্বপূর্ণ হবে তা বলাই বাহুল্য। তবে তারা ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার পাবে কি না, তা এখনও আলোচনা ও মূল্যায়নের পর্যায়ে আছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। যে কারণে এখনই চূড়ান্ত বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে না। তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত, সরকারের পরিস্থিতি বিবেচনা এবং আইন অনুযায়ী সবকিছু নির্ধারিত হবে।
তিনি আরো বলেন, নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর করতে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এ উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ ও গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দেশের নাগরিকদের ভোটের অধিকারের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট—এবারের নির্বাচন যেন মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনে, সেই পরিবেশ তৈরির প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, দেশের নাগরিকরা যেন নিরাপদে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাদের সর্বপ্রথম দায়িত্ব। তিনি বলেন, নিরাপদ ভোটকেন্দ্র, ভোটারদের স্বাধীন চলাচল ও ভোটাধিকার প্রয়োগে কোনো ধরনের বাধা সহ্য করা হবে না। পাশাপাশি ভোটের দিনসহ পুরো নির্বাচনকালীন সময়ে অপতৎপরতা, সহিংসতা বা নাশকতার চেষ্টাকে কঠোরভাবে দমন করা হবে।
এক সাংবাদিকের প্রশ্নে বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রসঙ্গ উঠে এলে তিনি বলেন, যে কোনো ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। “কোনো অবস্থাতেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা দেশের আইনবহির্ভূত কোনো পদক্ষেপ অনুমোদিত হবে না,” বলেন জাহাঙ্গীর আলম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ যদি দায়িত্বের বাইরে কোনো কার্যকলাপ করেন, তবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে জানান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি নির্বাচনকালে সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা আস্থা তৈরি করে। তবে সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হবে কি না, তা সবসময়ই রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার বিষয়। বিশেষত, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নানা সময় সামরিক উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আগাম সিদ্ধান্ত দিতে সরকারও সতর্ক।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এবং ভোটাররা নিজ নিজ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিরাপদে ভোট দিতে পারেন—এটাই জনগণের প্রধান প্রত্যাশা। আর সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থানই নয়, দরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সংলাপের পরিবেশ।
এখন দেশের মানুষের চোখ নির্বাচনী প্রস্তুতিপর্বের দিকে। নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা, প্রশাসনের অবস্থান, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হচ্ছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের চিত্র। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বার্তা, সরকারের তরফে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সতর্কতার ঘোষণা এবং যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার।
সামনে অপেক্ষা ভোটের দিন। ভোটের মাঠে সেনাবাহিনী কী ভূমিকা রাখবে, তাদের হাতে কী ক্ষমতা থাকবে—এখনই তা জানা না গেলেও, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মন্তব্য নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ ও আলোচনা বাড়িয়েছে সাধারণের মধ্যে। প্রত্যাশা, দেশের প্রতিটি নাগরিক আগামী নির্বাচনকে আস্থার জায়গায় নিয়ে যেতে দেখবেন। সেই আস্থার প্রশ্নেই সরকার, নির্বাচন কমিশন ও নিরাপত্তা বাহিনী এখন পূর্ণ প্রস্তুতির পথে।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, স্পষ্ট হবে সেনাবাহিনীর ভূমিকা, ক্ষমতা ও কার্যপরিধি। আর ততটাই স্পষ্ট হবে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার নতুন অধ্যায়ের চিত্র। তবে যে বার্তা স্পষ্ট—এই নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের সমঝোতা নয়; বরং শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও উদযাপনমুখর নির্বাচনের জন্য সবকিছুই বিবেচনায় রাখা হবে।