জুলাই গণআন্দোলনের শহীদের ভাই স্নিগ্ধ বিএনপিতে, আবেগঘন দৃশ্য গুলশানে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৮ বার
জুলাই গণআন্দোলনের শহীদের ভাই স্নিগ্ধ বিএনপিতে, আবেগঘন দৃশ্য গুলশানে

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর বুধবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ যোগ দিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে। মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সদস্য ফরম পূরণের মাধ্যমেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই দলে যোগ দেন। যোগদানের মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন ও নীরব কণ্ঠের, যেখানে স্মৃতি, শোক ও নতুন পথচলার অঙ্গীকার একসঙ্গে মিলেমিশে এক গভীর পরিবেশ সৃষ্টি করে।

বিএনপির মিডিয়া সেলের তরফে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, স্নিগ্ধকে সদস্য ফরম পূরণ করতে এবং দলের নেতাদের উপস্থিতিতে তা জমা দিতে। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি স্নিগ্ধকে স্বাগত জানান এবং তার প্রতি সমবেদনা ও সাহস জোগানোর ভাষণ দেন। উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম খান এবং দলের কেন্দ্রীয় ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক।

যমজ ভাইয়ের মৃত্যু মানুষের কাছে যেমন ভেঙে–যাওয়া এক জীবনের গল্প, তেমনই নতুন করে দাঁড়ানো ও কথা বলার দায়ও বয়ে আনে। স্নিগ্ধও যেন ঠিক সেই দায়িত্ব অনুভব করেই রাজনীতির ময়দানে পা রাখলেন। তিনি নিজেও জানিয়েছেন, মুগ্ধকে হারানো শুধু পারিবারিক শোক নয়, বরং একটি প্রজন্মের স্বপ্ন ভাঙা। সেই স্বপ্নকে নতুনভাবে দাঁড় করাতে রাজনীতি তার পথ।

মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আন্দোলনস্থলে সহপাঠীদের পানি বিতরণ করছিলেন তিনি। ১৮ জুলাই উত্তরা আজমপুর এলাকায় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তার মৃত্যু দেশের ছাত্রসমাজ ও সচেতন মহলে গভীর সাড়া ফেলে। হাতের পানির বোতল আর কান্নাভেজা চোখ—মুগ্ধের শেষ মুহূর্তের দৃশ্য বহু মানুষের হৃদয়ে ব্যথা হয়ে রয়ে গেছে এখনও।

সেই শোক, সেই ক্ষোভ, আর ভাইকে হারানোর যন্ত্রণা নিয়েই স্নিগ্ধ দীর্ঘ সময় চুপ ছিলেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেন একটি সংগঠিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কথা বলার জন্য। তার রাজনীতিতে যোগদান অনেকের কাছে নতুন বাস্তবতার প্রতীক, যেখানে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি একসময় জনআন্দোলনের শক্তিতে রূপ নেয়। তিনি জানান, তার লক্ষ্য শুধুই দলীয় সংসর্গ নয়; বরং ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সংগ্রামে অংশ নেওয়া।

এদিন অনুষ্ঠানস্থলে পরিবেশ ছিল গম্ভীর তবে দৃঢ়তায় ভরা। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “মুগ্ধ আমাদের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে থাকবে। তার রক্ত বৃথা যাবে না। তার ভাই আজ আমাদের সঙ্গে পথ শুরু করলেন—এটা এই দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য সাহসের বার্তা।” অন্য নেতারাও স্নিগ্ধকে স্বাগত জানান এবং মুগ্ধের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

রাজনীতিতে নতুনদের আগমন বাংলাদেশে নতুন নয়, তবে শোকের স্মৃতি বুকে নিয়ে কোনো পরিবার থেকে উঠে আসা রাজনীতির পথ সবসময়ই ভিন্ন মাত্রা রাখে। এ দেশ বহুবার দেখেছে, কীভাবে হারানো জীবনের ব্যথা নতুন কণ্ঠের জন্ম দেয়। ইতিহাসের পথে বহু পরিবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, আবার সেই পরিবারগুলোই নেতৃত্ব দিয়েছে পরিবর্তনের আন্দোলনে। হয়তো স্নিগ্ধও আজ নতুন গল্পের শুরুতে দাঁড়িয়ে।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যে শুধু নির্বাচন নয়, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের অনুভূতি ও স্বপ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত—স্নিগ্ধর যাত্রা সেই স্মারকই তুলে ধরছে। তিনি বলেছেন, “ভাইকে হারিয়ে আমি শূন্য হয়ে গিয়েছিলাম। আজ মনে হচ্ছে, লড়াইটা আমাদের থামানো যাবে না। ভাইয়ের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তেই রাজনীতিতে এলাম।”

এখন দেখার বিষয়, রাজনীতির পথে এই নবযাত্রা কতটা সফল হয় এবং স্নিগ্ধ কীভাবে তার ভাইয়ের স্বপ্ন ও গণআকাঙ্ক্ষাকে সামনে নিয়ে এগিয়ে যান। সময়ই বলবে তিনি কি পারবেন তার মতো আরো অনেক তরুণের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে এবং সত্যিকার অর্থে পরিবর্তনের স্রোতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—রাতের সেই নীরব মুহূর্তে গুলশানের দলের কার্যালয়ে স্নিগ্ধ যখন সদস্য ফরমে স্বাক্ষর করছিলেন, তখন শুধু একটি নাম নয়, বরং একটি শহীদের রক্তের স্মৃতি, একটি পরিবারের অশ্রু, এবং এক প্রজন্মের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা সেখানে লিপিবদ্ধ হচ্ছিল।

গণআন্দোলনের বুকে রক্ত রেখে যাওয়া মুগ্ধের ভাই আজ রাজনীতির পথে। ক্ষমতার লড়াইয়ের জন্য নয়, বরং সত্যিকার অর্থে একটি ন্যায়ের সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে। সেই পথ হয়তো কঠিন, প্রশ্নবিদ্ধ ও চ্যালেঞ্জে ভরা। কিন্তু ইতিহাস বলে, শোক ও ত্যাগ থেকে জন্ম নেওয়া রাজনীতি কখনো সহজে থামে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত