প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনের হাওয়া বইতেই আবারও আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি কৌশল। এক সময়ের প্রভাবশালী এই ইসলামপন্থি দলটি এবার মাঠে নামছে নতুন ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে—যা তাদের নেতাদের ভাষায় “নির্বাচনি সমঝোতা”, কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি হতে পারে একটি “বিশেষ” বা “গোপন নির্বাচনি কৌশল।” মূলত আসনভিত্তিক সমঝোতার মাধ্যমে ‘সব ভোট এক বাক্সে’ নেওয়ার ধারণাই এখন জামায়াতের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
দীর্ঘদিন ধরে দলটি প্রকাশ্যে কোনো নির্বাচনি জোটের ঘোষণা না দিলেও রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছিল, জামায়াত সমমনা ইসলামপন্থি দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি নির্বাচনি জোট গঠনের চেষ্টা করছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই গুঞ্জন আরও জোরালো হয়েছে যখন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমরা এখন আসনভিত্তিক নির্বাচনি সমঝোতার দিকে নজর দিচ্ছি। এর অর্থ হলো, যে এলাকায় যে প্রার্থী শক্তিশালী, সেখানে অন্যরা তাকে সমর্থন দেবে।” তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের এই কৌশল মূলত দ্বৈত লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ না হলেও নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হারিয়ে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, তারা চাইছে ইসলামী ভোট ব্যাংক যেন ছড়িয়ে না পড়ে। তাই সমমনা ছোট দলগুলোকে সামনে রেখে জামায়াত একধরনের “ছায়া-জোট” তৈরি করছে, যেখানে তাদের কর্মী ও ভোটাররা নির্দেশনা পাবে কাকে ভোট দিতে হবে। ফলে, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী না দিয়েও দলটি নির্বাচনে প্রভাব রাখতে পারবে।
জামায়াতের নেতারা অবশ্য বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। দলের এক শীর্ষস্থানীয় নেতা বলেন, “আমরা কোনো গোপন কৌশল নিচ্ছি না। বরং নির্বাচনের অংশগ্রহণমূলক চরিত্র বজায় রাখতে আমরা চাই বিভিন্ন দল নির্বাচনে অংশ নিক, কিন্তু আমাদের অবস্থান স্পষ্ট—যে প্রার্থী ইসলাম ও দেশপ্রেমে বিশ্বাসী, তাকেই আমরা সমর্থন করব।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের লক্ষ্য একটাই—ভোট যেন বিফলে না যায়।”
এই বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার, জামায়াত সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে বা নিজেদের নামে ভোটে না নেমে, কৌশলে নির্বাচনের মাঠে থাকতে চাইছে। এই কৌশলের আরেকটি দিক হলো ভোটকেন্দ্রিক ঐক্য। অর্থাৎ, বিভিন্ন জেলায় যেসব ইসলামী দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী জামায়াতের ঘনিষ্ঠ বা আদর্শিকভাবে সমমনা, তাদের পক্ষে জামায়াতের সংগঠন কাজ করবে। ফলে, মাঠপর্যায়ে দলীয় প্রতীক বা পোস্টার না থাকলেও জামায়াতের প্রচারণা চালু থাকবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এটি মূলত “বিকেন্দ্রীকৃত নির্বাচনি কৌশল”—যেখানে জাতীয় পর্যায়ের জোটের পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাব ও সামাজিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একজন বিশ্লেষক বলেন, “জামায়াত জানে যে তারা এখন আগের মতো প্রকাশ্যে নির্বাচনে নামতে পারবে না। তাই তারা এমন একটি পথ বেছে নিয়েছে যেখানে সংগঠন থাকবে, ভোট থাকবে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক ব্যানার থাকবে না। এটি রাজনৈতিকভাবে একটি বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ।”
অন্যদিকে, দলটির ভেতরের কিছু সূত্র জানাচ্ছে, জামায়াত ইতোমধ্যে অন্তত ৫০টির বেশি আসনে এমন সমঝোতা বা বোঝাপড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এসব আসনে ইসলামপন্থি অন্যান্য ছোট দল, এমনকি কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছে, যাদের সঙ্গে জামায়াতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। তারা একধরনের মৌখিক চুক্তির আওতায় কাজ করছে। এক আসনে একজন প্রার্থীকে সমর্থন দিলে অন্য আসনে সেই প্রার্থী বা দল জামায়াত-ঘনিষ্ঠ প্রার্থীকে সমর্থন দেবে—এমন এক পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই এগোচ্ছে তাদের কৌশল।
তবে জামায়াতের এই কৌশল নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ বলছেন, এটি একটি “চালাকি-নির্ভর কৌশল”, যা দীর্ঘমেয়াদে দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হতে পারে। আবার অনেকে বলছেন, “জামায়াত যদি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক জবাবদিহির মুখোমুখি না হয়, তবে এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক ড. আরিফুল ইসলাম বলেন, “জামায়াত এখন একটি পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নিজেদের পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করছে। তারা বুঝে গেছে, সরাসরি ময়দানে নামলে প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে। তাই তারা পরোক্ষভাবে ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব রাখার কৌশল নিয়েছে। এটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট পদক্ষেপ মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা সংগঠনকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।”
এদিকে, ইসলামপন্থি অন্যান্য দলগুলোর প্রতিক্রিয়া থেকেও ইঙ্গিত মেলে যে তাদের মধ্যে নির্বাচনি সমঝোতার বিষয়ে অঘোষিত একটি ঐক্যমত রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, ইসলামী ঐক্যজোট—এমন কয়েকটি দলের নেতারা সম্প্রতি নির্বাচনের বিষয়ে “সমমনা শক্তির সমন্বয়” নিয়ে কথা বলেছেন। যদিও তারা সরাসরি জামায়াতের সঙ্গে জোটের কথা অস্বীকার করেছেন, তবে বক্তব্যে “একসঙ্গে কাজ করার” ইঙ্গিত দিয়েছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াতের এই কৌশল শুধুমাত্র ভোট রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সংগঠন পুনরুজ্জীবনেরও অংশ। গত কয়েক বছর ধরে দলটি প্রশাসনিক চাপ, মামলাজট এবং জনমনে নেতিবাচক ভাবমূর্তি কাটিয়ে উঠতে সংগ্রাম করছে। এই অবস্থায় নির্বাচনের মাঠে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ না করেও প্রভাব বিস্তার করা—তা তাদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে।
তবে এই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের সমন্বয়ের ওপর। কারণ, ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক প্রভাব ও মতাদর্শিক পার্থক্য এখনো বড় বাধা। অনেক জায়গায় একাধিক দল নিজেদের প্রার্থী দিতে চায়, ফলে ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
একজন সাবেক নির্বাচনি কর্মকর্তা বলেন, “জামায়াতের কৌশল যদি সত্যিই কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে এটি নির্বাচনে তাদের একটি ‘অদৃশ্য উপস্থিতি’ তৈরি করবে। তবে এটি করতে গেলে স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী সংগঠন ও প্রচারণা প্রয়োজন। কারণ, ভোটারদের বোঝাতে হবে—তাদের ভোট আসলে কাকে দেওয়া হচ্ছে।”
সবশেষে বলা যায়, জামায়াতের “বিশেষ নির্বাচনি কৌশল” এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও গণমাধ্যমের আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে না নামলেও, বাস্তবে তাদের উপস্থিতি নির্বাচনি অঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে। “সব ভোট এক বাক্সে”—এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর অর্থবাহী কৌশলটি হয়তো ২০২৫ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণ তৈরি করবে।