ধর্মকে ব্যবহার করার অভিযোগ নিয়ে ডা. শফিকুর রহমানের অবস্থান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৭ বার
নির্বাচনের আগে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করাই প্রধান শর্ত: ডা. শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ধর্মকে ব্যবহার করার অভিযোগ প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, তাদের দল কখনো ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। বরং ধর্ম তাদের চিন্তা, বিশ্বাস ও আদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ধর্মকে ব্যবহার করার অভিযোগ তুলে বিএনপি নেতাদের সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে সোমবার দুপুরে ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি এ মন্তব্য করেন।

জামায়াত আমির বলেন, ধর্মকে কারা ব্যবহার করেন, তা দেশের মানুষ জানে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যারা আচমকা নামাজ পড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, টুপি পরেন, তসবিহ হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ান, ধর্মের প্রতি বাহ্যিক আকর্ষণ দেখাতে সচেষ্ট হন, তারা-ই আসলে ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেন। তাদের দলের রাজনীতি বিশ্বাস ও আদর্শ-নির্ভর হওয়ায় ধর্মকে কখনোই জনমত তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, জামায়াত তাদের কাজগুলো করে থাকে নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে, কিন্তু কোনোভাবেই ধর্মকে কাজে লাগিয়ে জনগণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে না।

বিশদ আলোচনার জন্য এদিন রাজধানীর গুলশানে ইইউ কার্যালয়ে আয়োজিত বৈঠকে আটটি দেশের রাষ্ট্রদূত ও তাঁদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, নির্বাচন প্রক্রিয়া, গণতন্ত্রের অগ্রগতি ও সমাজের অংশগ্রহণমূলক কাঠামো নিয়ে জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চান। বৈঠকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইনও উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদমাধ্যমকে ব্রিফ করতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব দলকে নিয়ে একটি ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ দেখতে চায়। তারা দেশের স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াত নির্বাচিত হলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়বে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলকে বাদ দেওয়া হবে না। জাতীয় ঐক্য ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পরিকল্পনা তাদের প্রস্তুত রয়েছে।

তিনি মনে করেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আগামী পাঁচ বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দূর করা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং জাতীয় ঐক্য গঠন করার জন্য একটি জাতীয় সরকারই যে সময়ের দাবি—এ কথা তিনি বৈঠকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, জাতীয় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে দুটি শর্ত অপরিহার্য হবে। প্রথমত, সরকারে অংশগ্রহণকারী কেউ দুর্নীতি করবেন না এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবেন না। দ্বিতীয়ত, আইনের প্রয়োগে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না, সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করা হবে। তিনি দাবি করেন, এমনকি তাদের দল ২০০টির বেশি আসনে জিতলেও তারা জাতীয় সরকার গঠনের এই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে দাঁড়াবে না।

বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা নির্বাচন ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক বিশেষ করে একই দিনে সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের বিষয়ে মতামত জানতে চান। এর জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ এখনো এমন রাজনৈতিক জটিলতা সচেতনভাবে পরিচালনা করার সক্ষমতা অর্জন করেনি। একই দিনে দুটি বড় নির্বাচন আয়োজন করলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে এবং ভোটার উপস্থিতি হ্রাস পেতে পারে। এজন্য তারা শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, নির্বাচন ও গণভোট আলাদা দিনে করা উচিত।

প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন বা পিআর ব্যবস্থার বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ইইউ প্রতিনিধিরা। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পিআর ব্যবস্থা শুধু দলের জন্য নয়, জনগণের জন্য প্রয়োজন। তাঁরা নির্বাচিত হলে এই ব্যবস্থাকে বাস্তবায়নের ব্যাপারে আন্তরিক থাকবেন। অতীতের রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থতার কারণে জনগণের আস্থা কমে গেছে বলে তিনি মনে করেন। তাই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য পিআর ব্যবস্থার মতো কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

সাক্ষাতে রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, অর্থনীতি, শিক্ষা বিনিময় কর্মসূচি, যুবসমাজের কর্মসংস্থান, অভিবাসন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। তারা রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কীভাবে হতে পারে, সে বিষয়েও জামায়াতের পরিকল্পনা জানতে চান। ডা. শফিকুর রহমান জানান, নির্বাচিত হলে জামায়াত সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ইতোমধ্যেই ঠিক করা আছে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো প্রকাশ করা হবে।

তিনি বলেন, ইইউ প্রতিনিধিরা যে উদ্বেগ ও পরামর্শ দিয়েছেন, তা অত্যন্ত আন্তরিক মনে হয়েছে। তারা বাংলাদেশকে এক স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা যেন আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, সেদিকে সকল রাজনৈতিক দলের মনোযোগ দেওয়া উচিত বলেও তিনি মনে করেন। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, দেশের উন্নয়ন ও রাষ্ট্র গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং সেই অংশগ্রহণ যেন আরও সক্রিয় থাকে—তাদের দল এমনটাই আশা করে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের অসুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন করলে জামায়াত আমির বলেন, সুস্থতা-অসুস্থতা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিনি দেশের মানুষের শ্রদ্ধা পেয়ে থাকেন এবং সবাই তাঁর জন্য দোয়া করেন। তবে কোনো নেতার অসুস্থতার কারণে রাজনীতি থেমে থাকে না। তিনি মনে করেন, দেশের প্রতিটি মানুষই সমাজের উন্নয়ন ও রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।

সামগ্রিকভাবে, ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, তাঁর দল নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে পুনর্বিন্যাস করছে এবং আন্তর্জাতিক মহলের সামনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছে। ধর্মীয় পরিচয় বা আবেগকে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান জানান, যা বৈঠকে উপস্থিত কূটনীতিকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত