ট্রাম্পের চাপের মধ্যেই নির্বাচনের প্রস্তুতির ঘোষণা জেলেনস্কির

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৮৯ বার
ট্রাম্পের চাপের মধ্যেই নির্বাচনের প্রস্তুতির ঘোষণা জেলেনস্কির

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান যুদ্ধে বিধ্বস্ত ইউক্রেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। মঙ্গলবার তিনি ঘোষণা করেছেন, যুদ্ধকালীন জটিলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তুত। তার এ ঘোষণা শুধু ইউক্রেন নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনার ঝড় তুলেছে। অনেকে মনে করছেন, এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের ফল। যুদ্ধের ভেতরেই নির্বাচন আয়োজনের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানই বড় ভূমিকা পালন করছে বলে বহু কূটনীতিক এবং বিশ্লেষক মনে করছেন।

একটি হোয়াটসঅ্যাপ ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর পর্বে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জেলেনস্কি বলেন, তিনি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত এবং প্রয়োজন হলে মিত্রদের সহযোগিতা চাইতে কোনো দ্বিধা নেই। তিনি সরাসরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নিরাপত্তা সহায়তা পেলে ভোট আয়োজন সম্ভব। যুদ্ধের সময় দেশে যেকোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হলেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর আস্থা রেখে তিনি ভোট আয়োজনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এবং দেশটির সংসদ যুদ্ধকালীন আইনের আওতায় নির্বাচনী বিধান সংশোধন করলে আগামী দুই বা তিন মাসের মধ্যেই ভোটগ্রহণ সম্ভব।

তার এই বক্তব্যের পরপরই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ট্রাম্প কয়েক দিন আগেই মন্তব্য করেছিলেন যে ইউক্রেনের এখন নির্বাচনের সময় এসেছে। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক। ট্রাম্পের এই বক্তব্য জেলেনস্কির ওপর একধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে, যা মঙ্গলবারের ঘোষণার পর আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইউক্রেনে ২০১৯ সালে নির্বাচনের পর এটি নতুন আরেকটি নির্বাচনী পর্ব হওয়ার কথা ছিল, তবে যুদ্ধের কারণে সেই প্রক্রিয়া স্থগিত ছিল।

ট্রাম্পের মন্তব্য নিয়ে ইউক্রেনের ভেতরে এবং বাইরে সমালোচনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কয়েকজন সদস্যসহ বিভিন্ন মহল মনে করেন, ট্রাম্প মাঝে মাঝে রাশিয়ার প্রচারণার ভাষা ব্যবহার করেন এবং ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল বলে মন্তব্য করে মস্কোর স্বার্থই অনিচ্ছাকৃতভাবে জোরদার করেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার বহু বছরের ব্যক্তিগত সম্পর্কও এসব আলোচনাকে আরও ঘনীভূত করে। এদিকে জেলেনস্কির সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনোই খুব উষ্ণ ছিল না। গত ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউস সফরে গেলে ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছ থেকে জেলেনস্কিকে প্রকাশ্য ভর্ৎসনার মুখোমুখি হতে হয়। অভিযোগ ছিল, যুক্তরাষ্ট্র যে বিপুল সহায়তা দিচ্ছে — ইউক্রেন সেই সহায়তার জন্য যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা দেখাচ্ছে না।

এমন জটিল পরিস্থিতির ভেতরেই রাশিয়ার আক্রমণে বিধ্বস্ত দেশের নেতৃত্বে থাকা জেলেনস্কি বারবার চেষ্টা করেছেন আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন ধরে রাখতে। যুদ্ধ শুরু হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সেই সময় থেকেই রাশিয়া দমন-পীড়ন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দমন এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের কারাগারে পাঠানোর অভিযোগের মুখে পড়ে। বিপরীতে ইউক্রেন বারবার নিজেদের গণতান্ত্রিক অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছে এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সহায়তা নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সামরিক আগ্রাসনের পাশাপাশি দেশটিতে মানবিক বিপর্যয়ও চরমে পৌঁছেছে। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠা এখন জেলেনস্কির প্রধান অগ্রাধিকার।

এ লক্ষ্যে সম্প্রতি তিনি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। ভ্যাটিকানে পোপ লিও চতুর্দশের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন তিনি। এরপর জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের নেতাদের সঙ্গে পরপর বৈঠক করেন। এসব বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধবিরতির জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় করা। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার সুযোগ খুঁজছে। তবে রাশিয়া কোনো ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

সোমবার একটি সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি আবারও স্পষ্ট ঘোষণা দেন—ইউক্রেন কোনো ভূখণ্ড রাশিয়াকে দেবে না। তার ভাষায়, দেশের আইন, সংবিধান, আন্তর্জাতিক আইন এমনকি নৈতিকভাবেও ইউক্রেনের কোনো অংশ ছেড়ে দেওয়ার অধিকার নেই। রাশিয়ার দখল করা অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো প্রকার সমঝোতায় যেতে তিনি প্রস্তুত নন।

ট্রাম্পের অনুমোদিত যে শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে, সেটিতে শুরুতে ছিল ২৮ দফা। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে ইউক্রেনকে দখলকৃত কিছু অঞ্চল ছেড়ে দিতে হবে। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, দীর্ঘ আলোচনার পর সেই দফা কমে ২০-এ নেমে এসেছে। তবে তিনি আবারও বলেন, তিনি ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ করার আগ্রহকে শ্রদ্ধা করলেও রাশিয়ার প্রতিশ্রুতি বা সদিচ্ছার ওপর বিশ্বাস রাখা যায় না।

ইউক্রেনের ভেতরে এখন নির্বাচন ঘিরে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। যুদ্ধের কারণে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত, বহু এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত, অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। ভোট আয়োজন করতে হলে নিরাপত্তা, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুতকরণ, বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক তদারকি—এসব মিলিয়ে বিশাল প্রস্তুতি নিতে হবে। এ কারণেই জেলেনস্কি বারবার বলছেন যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই নির্বাচন সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে জেলেনস্কির ঘোষণা ইউক্রেনের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ট্রাম্পের চাপ, আন্তর্জাতিক কূটনীতির টানাপোড়েন, রাশিয়ার হামলা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট—সবকিছুর ভেতর দিয়েই এখন ইউক্রেন নির্বাচন আয়োজনে এগোতে চায়। এই পথ কতটা মসৃণ হবে, কতটা সম্ভব হবে—সেটি এখন শুধু ইউক্রেন নয়, বিশ্বজুড়ে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com